সিপিডির প্রতিবেদন: মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতি মোকাবেলায় বাজেটে বড় চ্যালেঞ্জ
মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতি মোকাবেলায় বাজেটে চ্যালেঞ্জ

সিপিডির প্রতিবেদন: মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতি মোকাবেলায় বাজেটে বড় চ্যালেঞ্জ

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বহুমুখী চাপের মুখে পড়বে বলে সতর্ক করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এই বাজেটের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

রাজস্ব ঘাটতি ও উন্নয়ন ব্যয়ে ধীরগতি

সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায়ের প্রবৃদ্ধি মাত্র ১২.৯ শতাংশ হয়েছে, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪.৫ শতাংশ। এই সময়ে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বাকি সময়ে কর আদায় ৫৯ শতাংশ বাড়াতে হবে, যা বাস্তবায়ন কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে।

উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০.৩ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং বড় প্রকল্পের ব্যয় সীমিত করার সিদ্ধান্তকে এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতির চাপ ও বৈদেশিক খাতের মিশ্র চিত্র

চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

বৈদেশিক খাতে মিশ্র পরিস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রপ্তানি আয়ে ৩.২ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তবে একই সময়ে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ার কারণে বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩০.৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।

সুপারিশ: নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কর কমানো ও তামাকে কর বাড়ানো

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিপিডি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর কমানোর সুপারিশ করেছে। সৌর প্যানেল, বায়ু টারবাইন এবং ব্যাটারি স্টোরেজের মতো পণ্যের ওপর কাস্টমস ডিউটি সর্বোচ্চ ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বাড়ানোরও প্রস্তাব করা হয়েছে। সিগারেট, বিড়ি, জর্দা ও গুলের ওপর স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ এবং ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া জর্দা ও গুলের ওপর প্রতি গ্রামে ৬ টাকা নির্দিষ্ট আবগারি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

কৃষি, সামাজিক সুরক্ষা ও শিক্ষা খাতে জোর

প্রতিবেদনে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং খাল পুনঃখননের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘ফার্মার কার্ড’ কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সহায়তা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি কর্মসূচি সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়েছে। সিপিডির মতে, কার্যকর রাজস্ব সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

সংস্থাটির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান এবং নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের উপস্থাপনায় এই ব্রিফিংয়ে জোর দেওয়া হয়েছে যে, আসন্ন বাজেটে এসব বিষয় গুরুত্ব পেলে তা অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।