বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের নানা উদ্যোগ থাকলেও বাস্তব ফলাফল হতাশাজনক। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে নিট বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২০.২২ শতাংশ কমে ১১৪ কোটি ৪০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এফডিআই ও নিবন্ধিত বিনিয়োগে পতন
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগের অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে নিট এফডিআই ছিল ১৪৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এছাড়া, বিডায় নিবন্ধিত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমেছে প্রায় ৫৮ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছিল, সেখানে তা নেমে আসে মাত্র ৬৬ হাজার কোটি টাকায়।
চীন থেকে বিনিয়োগে ধস
চীন থেকে নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে প্রায় ৮৯ শতাংশ। আগের অর্থবছরে চীনা বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল প্রায় ৫,৭৩০ কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে আসে মাত্র ৬২০ কোটি টাকায়। আশিক চৌধুরীর চীন সফর ও বিনিয়োগ সেমিনার সত্ত্বেও এই হ্রাস বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাব নির্দেশ করে।
জ্বালানি সংকট ও ব্যাংকিং খাতের চ্যালেঞ্জ
আশিক চৌধুরী নিজেই স্বীকার করেছেন যে গ্যাসের ঘাটতি শিল্পায়নের সবচেয়ে বড় বাধা। অনেক অর্থনৈতিক অঞ্চল পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে পারছে না। অন্যদিকে, শিল্পঋণের সুদহার ১৫-১৬ শতাংশে পৌঁছেছে এবং খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে, ফলে ব্যাংকগুলো নতুন বিনিয়োগে ঋণ দিতে অনাগ্রহী।
ব্যবসা সহজীকরণে ঘোষণা বনাম বাস্তবতা
৪৮ ঘণ্টায় কোম্পানি নিবন্ধন, দ্রুত ভিসা, ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মতো উদ্যোগ থাকলেও মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা যায়নি। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, এনবিআর, পরিবেশ অধিদফতর, বিদ্যুৎ বিভাগের মধ্যে সমন্বয় দুর্বল থাকায় বিনিয়োগকারীদের একাধিক দপ্তরে যেতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “অন্তর্বর্তী সময়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিনিয়োগ কমে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়, তবে অতিরিক্ত প্রচারণার পরিবর্তে বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে দূর করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
সামনের চ্যালেঞ্জ
বিএনপি সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার জন্য জিডিপির অনুপাতে মোট বিনিয়োগ ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর প্রশ্ন তুলেছেন, দেশের ইতিহাসে বিনিয়োগ কখনও ৩২ শতাংশ অতিক্রম করেনি, সেখানে ৪০ শতাংশে পৌঁছানো কতটা বাস্তবসম্মত?
আশিক চৌধুরীর সাফল্য বা ব্যর্থতার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কারখানা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে রূপ নেবে।



