অনলাইনে আম বিক্রি করে সফল তরুণ উদ্যোক্তারা, লাভবান চাষিরাও
অনলাইনে আম বিক্রি করে সফল তরুণ উদ্যোক্তারা

অমর জ্যোতি চাকমা: পড়ালেখার পাশাপাশি সফল আমচাষি

খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার পুজগাং এলাকার বাসিন্দা অমর জ্যোতি চাকমা (২৫)। সম্প্রতি রাঙামাটি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন তিনি। পড়ালেখার পাশাপাশি এলাকায় চার একর জমিতে আমের বাগান রয়েছে তাঁর। সেই বাগান থেকেই চলতি বছর এ পর্যন্ত অন্তত চার লাখ টাকার আম বিক্রি করেছেন তিনি। আরও প্রায় তিন লাখ টাকার আম বিক্রি হবে বলে আশা তাঁর।

অমর জ্যোতি বলেন, ফেসবুকে তাঁর একটি পেজ রয়েছে। সেই পেজের মাধ্যমেই আম বিক্রি করছেন তিনি। পেজে তাঁর বাগানের আমের ছবি–ভিডিও দেখে ক্রেতারা আমের জন্য বুকিং দেন। এরপর কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে আম পাঠান তিনি। এরপর মুঠোফোনের আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মূল্য সংগ্রহ করেন।

অনলাইনে আম বিক্রির সুবিধা

কেবল অমর জ্যোতি চাকমা নন, তাঁর মতো খাগড়াছড়িতে আরও অনেক চাষি এভাবে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারে আম বিক্রি করে আসছেন। আবার চাষিদের কাছ থেকে আম সংগ্রহ করে একই কায়দায় বাজারজাতও করছেন স্থানীয় অনেক তরুণ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আম বিক্রেতারা জানান, কয়েক বছর আগেও স্থানীয় চাষিদের আম বিক্রি করতে দূরদূরান্ত থেকে আসা পাইকারদের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হতো। তবে এখন সেই নির্ভরতা অনেকটাই কমেছে। অনলাইনে আম বিক্রির ক্ষেত্রে নামে–বেনামে রাস্তাঘাটে টোল দিতে হয় না, দামও ভালো পাওয়া যায়; যার কারণে লাভ বেশি হচ্ছে চাষিদের। বাগান থেকে আম সংগ্রহ, প্যাকেজিংসহ সবকিছুই ভিডিও ও ছবি আকারে আগেই প্রকাশ করার কারণে ক্রেতারাও ঠকেন না।

অমর জ্যোতি চাকমার বাগানের বিবরণ

পানছড়ির আমচাষি অমর জ্যোতি বলেন, ‘পড়ালেখার পাশাপাশি পৈতৃক চার একর জমিতে ১১ জাতের আমগাছ লাগিয়েছিলাম। গত বছর ফলন আসতে শুরু করেছে। বলা যায়, এ বছরই আম বিক্রি করছি। ক্রেতারা ফেসবুক পেজে আমের জন্য বুকিং দেন। আমরা চেষ্টা করি ভালো আম সরবরাহ করে নিজের পেজের সুনাম বাড়াতে; যাতে ক্রেতাদের ধরে রাখা যায়।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাজ্জাদ হোসেন: চাকরি ছেড়ে অনলাইনে আম ব্যবসা

পানছড়ির মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সাজ্জাদ হোসেনের নিজের আমবাগান নেই। তবে তিনি চাষিদের কাছ থেকে আম সংগ্রহ করে অনলাইনে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে আসছেন। এর মধ্য দিয়ে ভালো লাভ হয় বলে দাবি তাঁর। সাজ্জাদ হোসেন বলেন, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছেন তিনি। এরপর চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন চাকরিও করেছেন। গত বছর থেকে চাকরি ছেড়ে অনলাইনে আমের ব্যবসা করছেন।

তরুণ উদ্যোক্তা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘অনলাইনে ব্যবসা শুরু করতে তুলনামূলক কম মূলধন লাগে। অর্ডার পাওয়ার পর বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে ক্রেতাদের কাছে পাঠাই। তবে বাগানমালিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘নিজের এলাকায় থেকে সম্মানজনক উপায়ে আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে, এতেই খুশি। এখন স্থানীয় অনেক তরুণ মৌসুমে অনলাইনে আম বিক্রির জন্য এগিয়ে আসছেন। এতে প্রান্তিক চাষিরাও লাভবান হচ্ছেন।’

উখামং মারমা: চার বছর ধরে অনলাইনে আম বিক্রি

সাজ্জাদ হোসেনের মতোই চাষিদের কাছ থেকে আম সংগ্রহ করে বিক্রি করেন খাগড়াছড়ি সদরের ভাইবোন ছড়া এলাকার বাসিন্দা উখামং মারমা। তিনি চট্টগ্রামের একটি কলেজের স্নাতকোত্তর শ্রেণির ছাত্র। উখামং বলেন, চার বছর ধরে আমের মৌসুমে বাগানিদের কাছ থেকে আম সংগ্রহের পর বিক্রি করে আসছেন তিনি।

উখামং বলেন, খাগড়াছড়িতে উৎপাদিত বারি–৪, বারি–৮, আম্রপালি, মল্লিকা, রাংগুই, চিয়াংমাই, সূর্যডিম ও স্থানীয় বিভিন্ন জাতের আমের চাহিদাই অনলাইনে রয়েছে। অনলাইনে প্রতিটি জাতের আমের ছবি, ওজন, স্বাদ ও মূল্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন তিনি। এতে ক্রেতারা সহজেই কী জাতের আম কিনবেন, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বাগান থেকে সরাসরি আম সংগ্রহ ও প্যাকেজিংয়ের ভিডিও প্রকাশ করায় ক্রেতাদের আস্থাও বেড়েছে।

নক্ষত্র ত্রিপুরা: নিজের বাগানের আম অনলাইনে বিক্রি

খাগড়াছড়ির চারমাইল এলাকায় আমের বাগান রয়েছে নক্ষত্র ত্রিপুরার। তিনিও অনলাইনে নিজের বাগানের আম বিক্রি করেন।

স্থানীয় সংগঠনের মতামত

খাগড়াছড়ি ফলদ মালিক সমিতির আহ্বায়ক কালো বরণ চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, ডিজিটাল বিপণন পাহাড়ি কৃষিপণ্যের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। আগে উৎপাদিত আমের একটি বড় অংশ স্থানীয় বাজারেই বিক্রি হতো। এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কারণে খাগড়াছড়ির আম ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে। এতে বাগানিরা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি বিপণনে যুক্ত উদ্যোক্তারাও আয় করছেন।

কৃষি বিভাগের বক্তব্য

খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দীন বলেন, অনলাইনে বিক্রির ফলে স্থানীয় কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন এবং ভোক্তারা নিরাপদ ও মানসম্মত ফল পাচ্ছেন। এ ছাড়া তরুণদের জন্য নতুন উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে পাহাড়ি কৃষিপণ্যের বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে।