দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার কয়েক দিন আগে নিজের নামে ট্রাম্প মিমকয়েন চালু করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর মধ্য দিয়ে তিনি যেমন ক্রিপ্টোবান্ধব প্রশাসনের সূচনা করেন, তেমনি এটি তাঁর পরিবারের জন্য অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা হয়ে ওঠে। এই উদ্যোগ থেকেই গত বছর ট্রাম্প কয়েক শ কোটি ডলার আয় করেন। সব মিলিয়ে ক্রিপ্টো–সম্পর্কিত বিভিন্ন উৎস থেকে তাঁর আয় ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি ছাড়িয়ে যায়।
মিমকয়েনের বাজারমূল্য ধস
তবে ট্রাম্প মিমকয়েনে বিনিয়োগকারীদের বেশির ভাগই এতটা ভাগ্যবান নন। বাজারে আসার পরপরই ট্রাম্প মিমকয়েনের বাজারমূল্য ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে উঠে যায় বলে জানায় কয়েন মার্কেট ক্যাপ। কিন্তু বর্তমানে এর বাজারমূল্য নেমে এসেছে মাত্র ৪০ কোটি ডলারে, অর্থাৎ মূল্য কমেছে ৯৭ শতাংশের বেশি। তবে মিমকয়েনের দামের পতনে ট্রাম্পের তেমন ক্ষতি হয়নি, বরং বিনিয়োগকারীরা লোকসান গুনলেও তিনি নানাভাবে লাভবান হয়ে গেছেন।
লেনদেন ফি থেকেই বড় আয়
ট্রাম্প বলেছেন, ২০২৫ সালে তাঁর যে সম্পদ বেড়েছে, এর মূল কৃতিত্ব শেয়ারবাজারের। নর্থ ডাকোটায় যাওয়ার আগে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘জানেন কীভাবে আমি লাভ করেছি—শেয়ারসূচক বাড়ছে, সবাই লাভ করছে।’ কথাটি আংশিকভাবে সত্য। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক বেড়েছে গড়ে প্রায় ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে ট্রাম্পের সম্পদ বৃদ্ধির মূল কারণ শেয়ারবাজার নয়, বরং গত বছর তাঁর সম্পদের বড় অংশ এসেছে ক্রিপ্টো খাত থেকে। সেই আয়ও সরাসরি ক্রিপ্টোতে বিনিয়োগ থেকে নয়।
মূলত ট্রেডারদের কাছে তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিক্রি করা টোকেনের লেনদেন ফি, লাইসেন্সিং ফি ও অন্যান্য রাজস্ব থেকেই ট্রাম্পের আয় হয়েছে। ট্রাম্পের মিমকয়েনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা তাঁর প্রতিষ্ঠানের হাতেই। ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিআইসি ডিজিটাল, ফাইট ফাইট ফাইট এলএলসি মিলে মোট সরবরাহের ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
সিএনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিজের আর্থিক বিষয় তদারকির দায়িত্ব তিনি প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন, আইন মেনেই তিনি সেটা করেছেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ভালো ব্যবসা জানি, অনেক অর্থ উপার্জন করেছি—যতটা হবে ভেবেছি, হয়েছে তারও বেশি। এরপর অন্যদের দিয়ে সেই অর্থ বিনিয়োগ করাই। কারা করছে, আমি জানিও না। বড় বড় প্রতিষ্ঠান এটি পরিচালনা করে। আমার ছেলে এরিক বিষয়টি দেখাশোনা করে। এ বিষয়ে আমি তাঁর সঙ্গে কথাও বলি না।’
বিপুল ক্রিপ্টোসম্পদ সম্পর্কে জানতেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘না। তবে জানলেও সমস্যা নেই। এতে বেআইনি কিছু নেই, ভুলও কিছু নেই।’
দাম বৃদ্ধি বা হ্রাস, ট্রাম্পের আয় হচ্ছেই
ট্রাম্প মিমকয়েনের বাজারমূল্য বাড়লে ট্রাম্প লাভবান হতে পারেন। তবে দামের হ্রাস বা বৃদ্ধি যা–ই হোক, প্রতিবার এই টোকেন কেনাবেচা হলেই তিনি লেনদেন মাশুল পান। এ ছাড়া ট্রাম্পের দুই ছেলে এরিক ট্রাম্প ও ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের আংশিক ব্যবস্থাপনা যে কোম্পানিটি আছে, সেখান থেকেও ট্রাম্প বড় অঙ্কের মুনাফা করেছেন। এই কোম্পানির নাম ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল এলএলসি। এই কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য টোকেন বিক্রি থেকেও ট্রাম্প ৫২ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি আয় করেছেন।
মিমকয়েন কী
মিমকয়েনের দাম সাধারণত দ্রুত বাড়ে, আবার দ্রুতই পড়ে যায়। কেননা, প্রচলিত অনেক ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো এগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক মূল্য নেই। এগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জল্পনানির্ভর সম্পদ। ফলে নানা ধরনের প্রতারণাও হয়। বিষয়টি হলো, ট্রাম্প ও মেলানিয়া টোকেনে কোনো ধরনের প্রতারণা হবে না, এমন প্রচারণা দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডি একবারে সব টোকেন বিক্রি করতে পারবেন না; তিন বছর ধরে ধাপে ধাপে তা বিক্রি করতে হবে।
তবে কোনো মিমকয়েন প্রতারণামুক্ত হলেই যে বিনিয়োগের ভালো উৎস হবে, এমন নয়। তাহলে কথা হচ্ছে, মানুষ কেন ট্রাম্পকয়েন কিনেছিল। কেউ হয়তো প্রেসিডেন্টকে সমর্থন জানাতে এই টোকেন কিনেছেন। কেউ নতুনত্বের আকর্ষণে, আবার কেউ বেশি মুনাফার আশায় বিনিয়োগ করেছেন। তবে যাঁরা বড় বিনিয়োগ করেছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। তাঁরা ট্রাম্পের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাওয়ার আশায় এই মিমকয়েনে অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন।
গত মে মাসে ট্রাম্পকয়েনের শীর্ষ ২২০ জন বিনিয়োগকারীর জন্য ট্রাম্প ব্ল্যাক-টাই ডিনারের (আনুষ্ঠানিক ও মর্যাদাপূর্ণ নৈশভোজ, যেখানে অতিথিদের নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক পোশাক পরে অংশ নিতে হয়) আয়োজন করেন। এই বিনিয়োগকারীরা তাঁর ক্রিপ্টো টোকেনে মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন। শীর্ষ ২৫ জন বিনিয়োগকারী প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিশেষ ভিআইপি সংবর্ধনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।
গত এক বছরে বিনিয়োগ হিসেবে ট্রাম্প মিমকয়েন হয়তো ভালো কিছু ছিল না। তবে কিছু বিনিয়োগকারী অন্তত প্রেসিডেন্টের সান্নিধ্য পেয়েছেন। সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছেন ট্রাম্প নিজেই।



