আইএমএফের নজরে নবম পে স্কেল, নতুন ঋণ পেতে সংস্কারের শর্ত
আইএমএফের নজরে নবম পে স্কেল, নতুন ঋণ পেতে সংস্কারের শর্ত

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশকে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসতে যাচ্ছে। তবে ঋণ অনুমোদনের আগে চলতি অর্থবছরের বাজেট, রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থায়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চাইছে সংস্থাটি।

ঢাকা সফর করবে আইএমএফ প্রতিনিধি দল

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১২ থেকে ১৬ জুলাই আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করবে। সফরের প্রথম দিন অর্থ বিভাগের সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম বৈঠকে বাজেট, রাজস্বনীতি, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থায়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে। দ্বিতীয় বৈঠকে গুরুত্ব পাবে নবম জাতীয় পে স্কেল, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং এ খাতে সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা।

নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের খরচ

চলতি বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। জুলাই থেকেই নতুন পে স্কেল কার্যকর হয়েছে। অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইএমএফের কাছে সরকারের মধ্যমেয়াদি বাজেট পরিকল্পনা, রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং নতুন পে স্কেলের অর্থায়নের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে। সরকারের প্রত্যাশা, এসব আলোচনার ভিত্তিতে নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে নবম পে স্কেলের জন্য অতিরিক্ত ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হবে। এই অর্থ বাজেটের অপ্রত্যাশিত ব্যয় খাতে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে। সরকার আগামী অর্থবছরের মধ্যে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ পে স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে।

আইএমএফের শর্ত ও উদ্বেগ

এ অবস্থায় আইএমএফ জানতে চাইছে, বর্তমান রাজস্ব আদায়ের ধারা, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং কমে যাওয়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে অতিরিক্ত এই ব্যয় কীভাবে সামাল দেওয়া হবে। সংস্থাটির মতে, নতুন ঋণ কর্মসূচি অনুমোদনের জন্য সরকারের শক্তিশালী নীতিগত অঙ্গীকার, বাস্তবসম্মত সংস্কার পরিকল্পনা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার গ্রহণযোগ্য ভিত্তি থাকা প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, “বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা রাজস্ব আহরণ। জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার অনেক কম। অন্যদিকে সরকারি ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ফলে পে-স্কেলের মতো বড় ব্যয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে বাজেট ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়ে যাবে।”

রাজস্ব আহরণে ব্যর্থতা

আইএমএফের পর্যবেক্ষণে রয়েছে, কয়েক বছর ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। একই সময়ে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতিও অর্থনীতির জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও দক্ষতা দেখাতে হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ এবং ই-হেলথ কার্ড কর্মসূচি চালুর ঘোষণাও আইএমএফের আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, স্বাস্থ্য খাত এবং সরকারি বেতন ব্যয় একসঙ্গে বাড়লে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর তার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কেও বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাইবে প্রতিনিধি দল।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, “সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। তবে এর সঙ্গে অবশ্যই রাজস্ব আহরণ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সমন্বয় থাকতে হবে। সরকারকে ব্যয়ের পাশাপাশি রাজস্ব বৃদ্ধির বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দেখাতে হবে। আইএমএফ হয়তো সেটিই দেখতে চাইছে।”

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, “আইএমএফ শুধু ঋণ দেয় না, অর্থনীতির সক্ষমতাও মূল্যায়ন করে। নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা সম্ভব, তবে একই সঙ্গে কর সংস্কার, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো জরুরি। অন্যথায় সরকারের আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।”

সংস্কারের গুরুত্ব

অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণ কর্মসূচি অনুমোদনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে আইএমএফের সুপারিশ করা সংস্কার বাস্তবায়ন। কারণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষ ব্যবস্থাপনাই আগামী দিনে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নির্ধারণ করবে।