মাদকমুক্ত জীবন ফিরে পেতে সিরাজগঞ্জের সলপের ঘোল বিক্রি করে সফল শরিফুল
মাদক ছেড়ে সলপের ঘোল ব্যবসায় সফল শরিফুল

রাজশাহী নগরের মেহেরচণ্ডী এলাকায় আরডিএ ওভারপাসের নিচে হাস্যোজ্জ্বল শরিফুল ইসলাম (৪৫) সিরাজগঞ্জ থেকে আনা ‘সলপের ঘোল’ বিক্রি করেন। বছরের অন্য সময় তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘোল বিক্রি করেন। সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে আলাপে জানা গেল, জীবনটা একসময় এমন ছিল না। জীবনের দীর্ঘ সময় মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। ঘোলের ব্যবসা তাঁকে সচ্ছলতা দেখিয়েছে, সহায়তা করেছে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতে।

শরিফুলের পটভূমি ও ব্যবসার শুরু

শরিফুল ইসলামের বাড়ি পবা উপজেলার কাটাখালী পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মিজানের মোড়ে। তাঁর বাবার নাম আকবর আলী। বছর পাঁচ হলো তিনি রাজশাহীতে সিরাজগঞ্জের সলপের ঘোল বিক্রি করেন। আগে শীতের মৌসুমে ফলের ব্যবসা করতেন। এখন প্রধান পেশা সলপের ঘোল বিক্রি করা। রাজশাহী শহরে তাঁর তিনটি সলপের ঘোলের ভ্যান রয়েছে। একটিতে নিজেই বিক্রি করেন। অপর দুটি নিজস্ব লোক রেখে পরিচালনা করেন।

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় তৈরি সুস্বাদু পানীয় ‘সলপের ঘোল’ নামে খ্যাতি পেয়েছে। শুধু চলনবিল ও যমুনা নদীবেষ্টিত এই জনপদে নয়, দূরদূরান্তে ছড়িয়ে আছে সলপের ঘোলের সুনাম। এই ঘোল তৈরির পেছনে আছে শত বছরের ঐতিহ্য। উল্লাপাড়ার সলপ এলাকায় তৈরি এই ঘোল অন্যান্য জেলায়ও বিক্রি হয়। এই ঘোলই আলোর পথ দেখিয়েছে পবার শরিফুল ইসলামকে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ব্যবসার সম্প্রসারণ ও বর্তমান অবস্থা

সম্প্রতি শরিফুলের সঙ্গে কথা হয় সিরাজগঞ্জ থেকে আনা সলপের ঘোল বিক্রির পেশা নিয়ে। তিনি জানান, বছর পাঁচেক আগে তিনি গাজীপুরের টঙ্গীতে ইজতেমায় যান। তাঁর কিছু দিন আগে তিনি কেক, বেকারিজাতীয় কিছু বিক্রি করতেন। সেখানে গিয়ে দেখেন বিশেষ ধরনের একটি ভ্যানে সলপের ঘোল বিক্রি করা হচ্ছে। সিরাজগঞ্জ থেকে আনা এমন ঘোল টঙ্গীতে বিক্রি হচ্ছে, রাজশাহীতে কেন নয়। এমন ধারণা থেকেই ইজতেমা থেকে ফিরে তিনি একসঙ্গে তিনটি ওই বিশেষ ধরনের ভ্যান তৈরির অর্ডার দিলেন। এর সঙ্গে সিরাজগঞ্জেও যোগাযোগ করলেন। সেই থেকে শুরু তাঁর। ঘোল বিক্রি করলেও শরিফুলের গাড়িতে সাঁটানো স্টিকারে লেখা—‘সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সলপের ঠান্ডা মাঠা’।

এখন রাজশাহী শহরে তিন এলাকায় শরিফুলের তিনটি ভ্যানে করে বিক্রি করা হয় সলপের ঘোল। প্রতিদিন তাঁর গড় বিক্রির চাহিদা প্রায় ২০০ লিটার। তবে গরম পড়লে তা ৩০০ লিটারের বেশি হয়। প্রতিদিন সকালে বিশেষ ধরনের ট্যাংকে করে সিরাজগঞ্জ থেকে বাসযোগে সলপের ঘোল চলে আসে। প্রতিদিনের ঘোল প্রতিদিনই শেষ হয়ে যায়। প্রতি লিটার ১০০ টাকায় তিনি বিক্রি করেন।

গ্রাহকদের প্রতিক্রিয়া ও ব্যবসার সাফল্য

নগরের মেহেরচণ্ডী এলাকায় শরিফুরের সলপের ঘোলের গাড়ির কাছে কথা হচ্ছিল মো. রশিদ নামের এক রিকশাচালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন দুপুর করে এই ঘোল খাওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে আমার। এ কারণে দুপুরের দিকে এদিকে যাত্রী নিয়ে যাই।’ বেসরকারি বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রায়হান হোসেন বললেন, ‘সিরাজগঞ্জের এই ঘোল রাজশাহীতে খেতে পারছি, এটাই অনেক। রাজশাহী শহরে আরও অনেক ঘোল খেয়েছি। কিন্তু এর স্বাদ অন্য রকম।’

শরিফুল জানান, তাঁর ব্যবসা সারা বছরই চলে। অনেকে সলপের ঘোলের ভক্ত হয়ে গেছে। সর্বনিম্ন ২০ টাকা গ্লাস থেকে শুরু তাঁর বিক্রি। দিন দিন এর চাহিদা বাড়ছে। ঘোলের ব্যবসা করে দিনকাল ভালো চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার চার মেয়ে। ছেলে নেই। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। দুই মেয়ে পড়ছে। তাদের নিয়েই এখন আমার জীবন। এই ব্যবসার পাশাপাশি পরিবারকে সময় দিই। অথচ আগে এসবের কিছুই করতাম না। জীবনটা অন্য রকম ছিল।’

মাদকাসক্ত জীবন থেকে ফেরা

একটা সময় মাদকের সঙ্গে ওঠবস ছিল শরিফুলের। ঘোল ব্যবসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন তিনি। ওই জীবন থেকে কীভাবে বেরিয়ে এলেন, সেই গল্পও জানালেন শরিফুল। বললেন, ‘আমার ভালো দিকে ফিরে আসা কারও দিকে তাকিয়ে নয়। আমার নিজের দিকে তাকিয়েই ফিরে আসা। অনেকে অনেক রকম পরামর্শ দেয়, কিন্তু এ রকম সাপোর্ট করা লাগেনি। অনেকে আমাকে চেষ্টা করেছে। কেউ পারেনি। আমার চারটা মেয়ে। দুইটা বিয়ে দিয়েছি। দুজনকে পড়াচ্ছি। অনেকে চেষ্টা করেছে আমাকে ভালো করার জন্য। কিন্তু কেউ পারেনি। এই মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়েই ভালো হয়েছি। নিজ ইচ্ছেয়, নিজের দিক থেকেই ভালো হয়ে গেছি।’

শরিফুলের মতে, ‘মানুষ পারে না এমন কোনো জিনিস নেই। এই মানুষই সর্বোচ্চ ওপরে উঠে যেতে পারে, আবার সবচেয়ে নিচে নেমে যেতে পারে। মানুষ বলে যে না এটা পারবে না, এটা অসম্ভব। কিন্তু অসম্ভব বলে কিছু নেই। মানুষ চাইলে সব সম্ভব। মানুষ সর্বোচ্চ ভালো হতে পারে, আবার সর্বোচ্চ খারাপও হতে পারে। আমার জীবনটাও এমনই।’

অর্থনৈতিক সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ঘোলের ব্যবসা করে শরিফুল ইসলাম সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়েছেন। কয়েক বছরে সাড়ে তিন লাখ টাকার বেশি ঋণ শোধ করে জমিও কিনেছেন। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। জামাতাদের ব্যবসা ধরিয়ে দিয়েছেন। এর পাশাপাশি তিনি ফাস্ট ফুডের বড় দোকান দিয়ে সেখানে কর্মচারী দিয়ে চালাচ্ছেন। শরিফুল বললেন, ‘ঘোলের ব্যবসা আমি খুব মনোযোগ দিয়ে করছি। তাই সফল হচ্ছি।’