দিনাজপুরে চামড়ার বাজার ধস, বিক্রেতারা ক্ষুব্ধ
দিনাজপুরে চামড়ার বাজারে ধস, বিক্রেতাদের ক্ষোভ

এবারও চামড়ার দাম নেই উত্তরের জেলা দিনাজপুরে। আর ছাগলের চামড়া ক্রয়-বিক্রয় হয়নি। শুধু ছাগলের চামড়াই নয়, অনেকে গরুর চামড়াও ফেলে চলে গেছেন। বিক্রেতাদের অভিযোগ, নানান অজুহাতে কম দাম দিয়ে চামড়া ক্রয় করেছেন ব্যবসায়ীরা। সব ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে এখানে চামড়ার দাম কম করেছেন। ফলে অনেকেই ক্ষোভে চামড়া ড্রেনে এবং রাস্তার পাশে ফেলে গেছেন।

রামনগর বাজারের করুণ অবস্থা

একটা সময় ছিল দিনাজপুরের রামনগর উত্তরবঙ্গের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার বাজার। এখানে দিনাজপুর জেলার পাশাপাশি পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী জেলার চামড়া আসতো। এখানকার ব্যবসায়ী এবং বাইরে থেকে ব্যবসায়ীরা এসব চামড়া ক্রয় করতো। কিন্তু এখন এই বাজারের হাঁকডাক নেই। গত কয়েক বছরে এই চামড়ার বাজারে আসছেন না বাইরের ব্যবসায়ীরা। চামড়ার দাম ক্রমান্বয়ে কম হওয়ায় পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী জেলার চামড়াও এখানে আসছে না। বিগত সময়গুলোতে যেখানে ৯০ হাজার থেকে এক লাখ চামড়া বেচাকেনা হতো, এবারে হয়েছে মাত্র ২০ হাজারের মত। সেটিও একেবারে নিম্নমূল্যে। জেলার ১৩টি উপজেলার চামড়াও আসেনি এখানে। এরপরও যেটুকু চামড়া এসেছিল সেটিরও ঠিকভাবে দাম হয়নি। মাত্র কয়েকজন ব্যবসায়ী নিজের ইচ্ছেমত দাম হাঁকিয়ে চামড়া ক্রয় করেছেন বলে অভিযোগ চামড়া বিক্রেতাদের।

সরকারি দাম নির্ধারণ উপেক্ষা

তাদের অভিযোগ, সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেও গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ২০ টাকা থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে। আর ছাগলের চামড়া প্রথম দিনে ১০ টাকা থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হলেও পরে ছাগলের চামড়া কেউই ক্রয় করেনি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্ষুব্ধ বিক্রেতাদের বক্তব্য

চামড়া নিয়ে আসা বিক্রেতা মোজাহের আলী বলেন, 'সরকার তো সকল ধরনের চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এই চামড়ার সঠিক দাম দিচ্ছে না। আমি একটি ছাগলের চামড়া এনেছি। আমার এই ছাগলের মূল্য ছিল ২২ হাজার টাকা। কিন্তু এখন এই চামড়া তারা নিতেই চাচ্ছেন না।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মোশারফ হোসেন বলেন, 'এবারে চামড়ার কোনও দাম নেই। আমি একটি ৬৫ হাজার টাকা দামের গরুর চামড়া বিক্রি করলাম মাত্র ৫০ টাকা দিয়ে আরও একটি ছাগলের চামড়া বিক্রি করলাম শুধুমাত্র ১০ টাকা দিয়ে। আমি এই চামড়াগুলো ১৫০ টাকা গাড়ি ভাড়া দিয়ে এনেছি। কিন্তু এই চামড়ার টাকা দিয়ে আমার গাড়ির ভাড়াই উঠবে না। এখানে সব ব্যবসায়ী একত্রিত হয়ে নিজেদের ইচ্ছেমত দাম করছেন। আর আমাদেরকে বাধ্য হয়েই কম দামে চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে।'

হুমায়ুন বলেন, 'ছাগলের চামড়া বিক্রির জন্য আনার পর এর দাম বলতেছে ১০ থেকে ২০ টাকা। এখানে সরকারের তদারকির প্রয়োজন ছিল। একটা চায়ের দাম যদি ৫ টাকা হয় তাহলে একটা চামড়ার দাম কীভাবে ১০ টাকা হয়। বাজারে একজোড়া জুতা দুই থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে কিন্তু একটি গরুর চামড়ার দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এই দেশের কোনও আইন নেই। এর জন্য দায়ী আমি মনে করি সরকার। সরকারের উচিত এই বিষয়ে তদারকি করা।'

সিরাজুল ইসলাম বলেন, 'এখানকার ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে চামড়া ক্রয় করেছে। আমাদেরকে যেভাবে ঠকানো হচ্ছে সেটি দেখারও কেউই নেই।'

মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দুরবস্থা

মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী আব্দুস সোহান বলেন, 'আমি গ্রাম থেকে মোট আটটি চামড়া নিয়ে এসেছি। ব্যবসায়ীরা এই আটটি চামড়ার দাম বলছে ৪০০ টাকা, আবার কেউ বলছে ৫০০ টাকা সবশেষে প্রতিটি চামড়া ১০০ টাকা করে দিতে চেয়েছে। চামড়ার বাজারের এমন অবস্থা হলে আমরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হবো। দিনাজপুরে বর্তমানে একটি মাত্র চামড়ার আড়ত রয়েছে। এখন যদি ভালো দাম না পাই তাহলে এখানেই চামড়া ফেলে দিয়ে চলে যাবো।'

আরেক মৌসুমী ব্যবসায়ী হারুন অর রশিদ বলেন, 'চামড়ার বাজারের অবস্থা একদম ভালো না। আমি ১৩টি চামড়া কিনে এনেছি। প্রতিটি চামড়া আমি ৬০০ টাকা দরে কিনে নিয়ে এসেছি। কিন্তু ব্যবসায়ীরা প্রতিটি চামড়া ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বলছে। আমার এখানে এক লাখ পঞ্চাশ টাকার একটি গরুর চামড়া রয়েছে ব্যবসায়ী যার দাম বলতেছে ২০০ টাকা।'

ব্যবসায়ীদের নানা সমস্যা

চামড়া ব্যবসায়ী ইস্কান্দার আলী বলেন, 'চামড়ার বাজারে সরকারের নজরদারির প্রয়োজন আছে। বর্তমান বাজারে চামড়া প্রস্তুতকরণ দ্রব্য যেমন বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল, লবণ ও চামড়ার পরিবহন খরচ সবকিছুই অনেক বেশি। আমরা অনেক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে রয়েছি। এছাড়া সরকার এসব চামড়ার মূল্য নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে কিন্তু আমরা চামড়া বিক্রি করতে গেলে এর সঠিক সেই মূল্য পাচ্ছি না।'

চামড়া ব্যবসায় আরিফ বলেন, 'আমরা চামড়া কিনতেছি কিন্তু এখানে অনেক চামড়া কেনার পর দেখা যাচ্ছে যে ওই চামড়া লাম্পি রোগের আক্রান্ত কোনও গরুর। পরে আমরা যখন এই চামড়াগুলো ঢাকায় নিয়ে যাই তখন এই চামড়া কেউ কিনতে চায় না। যেখানে সাধারণ চামড়ার দাম ৮০০ টাকা তখন এই লাম্পি আক্রান্ত চামড়ার দাম হয় ১০০ টাকা। এ ছাড়া আমরা চামড়ার টাকা ঠিকমতো পাচ্ছি না। আমাদেরকে বলা হয় একমাস পরে চামড়ার টাকা দিবো কিন্তু আমরা একবছরেও টাকা পাই না। আমি এখনও গতবছরের চামড়ার টাকা পাবো। কিন্তু তারপরও আমরা টাকা ধার করে চামড়া কিনছি।'