ঈদের দিনও পরিবার ছেড়ে ঢাকায় কসাই, উপার্জনের তাগিদে
ঈদের দিনও পরিবার ছেড়ে ঢাকায় কসাই, উপার্জনের তাগিদে

১৩ বছর ধরে কোরবানির ঈদের দিন ঢাকায় কাটান আইয়ুব হোসেন। পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার এই বাসিন্দা মৌসুমি কসাই হিসেবে বাড়তি আয় করেন, পাশাপাশি মাংসও পান। সেই মাংস তিনি সড়কের পাশে বিক্রি করেন। তিনি বলেন, “কোরবানি উপলক্ষে প্রতি বছর ঢাকা আসি।”

ঈদের দিন সন্ধ্যায় দেখা

বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ঈদের দিন সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ এলাকায় আইয়ুব আলীর সঙ্গে দেখা যায়। তিনি বেশ আনন্দে উচ্ছ্বসিত। কাছে দাঁড়াতেই বললেন, ‘স্যার মাত্র তিনশ টাকা কেজি।’

স্ত্রী-সন্তান ছাড়া আসার কারণ

ঈদের দিন স্ত্রী-সন্তান ছাড়া ঢাকায় আসা খুব প্রয়োজন কি না জানতে চাইলে তিনি আঞ্চলিক একটি গানের দুই লাইন শোনান: ‘অভাবে স্বভাব নষ্ট, ভজনে কূল নষ্ট, বাড়ি নষ্ট বুড়ির কারণে’। গানের অর্থ ব্যাখ্যা করে আইয়ুব আলী বলেন, “অভাবী মানুষ। কষ্টের মধ্যে চলে আসছি। অভাবী মানুষ বিয়ে করছি, সংসার হইছে, তাদের জন্যই তো আমার ঈদ।”

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইয়ুব আলী আরও জানান, “আমার মতো অনেকেই ঈদের দিন অন্য লোকের কোরবানির গরুর মাংস তৈরি করে দিয়ে বাড়তি টাকা আয় করেন। ঈদের পর বৌ-বাচ্ছা নিয়ে আনন্দ বেশি হয়।”

৬৪ বছর বয়সী চাঁদ আলী

স্ত্রী-সন্তান গ্রামে রেখে কোরবানির ঈদের দিন ঢাকায় অবস্থান করেন ৬৪ বছর বয়সী চাঁদ আলীও। কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে ঈদের দিন সকাল থেকে পাঁচটি গরুর মাংস তৈরি করেছেন তিনি। চাঁদ মিয়া বলেন, “আমার জীবনে কোরবানির ঈদ নেই। স্ত্রী-সন্তানের জন্যই ঢাকায় আসছি।”

কুষ্টিয়ার সদরের পাটিকাবাড়ি এলাকার এই বাসিন্দা আরও বলেন, “জীবনের ৪০ বছর কোরবানির ঈদ কখনও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে করতে পারিনি। অভাবের সংসারে তিন বেলা খাবার জোগাড় করতেই বছর পার হয়ে যায়। তাই প্রতি বছরই ঢাকায় আসি কোরবানির মাংস তৈরির কাজে।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চাঁদ আলীর পরিবার

চাঁদ আলী জানান, স্ত্রী মনোয়ারা খাতুনের বয়স প্রায় তার সমান। সন্তানদের নিয়ে বাড়িতে অপেক্ষা করেন কোরবানির ঈদের পরদিনের জন্য। তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, ঘরে একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে রয়েছে। ঈদের দিন বাড়িতে না থাকার জন্য তার কোনও আক্ষেপ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “প্রথম দিকে খারাপ লাগতো। এখন আর লাগে না। আমাদের জীবনে তো আর ঈদ নেই।”

শুধু এই দুজনই নন

শুধু এই দুজনই নন, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে শত শত মানুষ বাড়তি আয়ের আশায় গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন। ঈদের আনন্দ বাদ দিয়ে ঢাকায় দিনভর পরিশ্রম করেন তারা। পঞ্চগড়ের শাহীন ও নূন হোসেন জানান, প্রতি বছর ঈদের দিন কাটে ঢাকায়। বাড়তি আয়ের জন্যই প্রতি বছর তারা ঈদের আনন্দ মাটি করে ঢাকায় কাটান।

মঙ্গলবার বিকালে ছাগল ব্যবসায়ী শরিয়তপুরের ষাটোর্ধ্ব আনোয়ার হোসেন মাঝি বলেন, “আমরা বছরের পর বছর ঈদের দিন কাটাই রাস্তায়। ঢাকায় ঘর ভাড়া নিয়ে ছাগলের সঙ্গেই শুয়ে থাকি রাতে। আর দিনে রাস্তায়। ১৯৮৮ সাল থেকে কোরবানির ঈদ পরিবারের সঙ্গে করিনি। আগে খুব খারাপ লাগতো। এখন মনে হয় লাভ বেশি হলেই আনন্দ।”

সংগ্রহ করা মাংস বিক্রি ২৫০-৩০০ টাকায়

দিনভর নারী ও শিশুদের সংগ্রহ করা মাংস কিনে অনেকেই বিক্রি করছেন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে। বিভিন্ন হোটেল ব্যবসায়ী ও নিম্নমধ্যবিত্তদের দেখা গেছে মাংস কিনতে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ক্রেতা জানান, ভালো মাংস পেলে কিনবেন।

পাশেই গরু জবাই করে কয়েকজন মৌসুমি ব্যবসায়ী মাংস বিক্রি করছেন। নিম্নমধ্যবিত্তরা সেখানে ভিড় করেই মাংস কিনছেন। তবে, এই মাংসের দাম সাড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি।

মাংস বিক্রেতা আব্দুল মান্নান

মোহাম্মদী হাউজিংয়ের প্রধান সড়কে ভ্যানে মাংস বিক্রি করছিলেন আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, “এখানে মাংস বিক্রি হয় প্রতি বছর। ঈদের জন্য আগেই গরু কিনে ঠকেছি। বেশি দামে গরু কিনেছি। যারা কোরবানি দিতে পারেন না তাদের জন্য মাংস বিক্রি করি। আমার যা বাড়তি আয় হয় তা দিয়ে ঈদের সময় সংসারে কাজে লাগে। গতবারের লাভ করেছিলাম। এবার হবে না।”

স্বপন বাবুর্চি গরু কিনে মাংস বিক্রি করছেন এই রোডে। তিনি চাঁদ রাতে গরু কিনেছেন কম দামে। সাড়ে ৭০০ টাকা কেজি মাংস বিক্রি করছেন। স্বপন বাবুর্চি জানান, বাড়তি কিছু আয় করতে ঈদের দিন এই কাজ করছেন তিনি।