ইসলামী ব্যাংকের সংকট: খুরশীদ আলমকে সরিয়ে আস্থা ফেরানোর পথে কেন্দ্রীয় ব্যাংক
ইসলামী ব্যাংকের সংকট: খুরশীদ আলমকে সরিয়ে আস্থা ফেরানোর পথে

দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক এবং সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি গত দুই সপ্তাহে এমন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল— যা শুধু একটি ব্যাংকের নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল। আমানতকারীদের দীর্ঘ সারি, প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকা উত্তোলন, এটিএমে নগদ অর্থের সংকট, আরটিজিএস সেবা ব্যাহত হওয়া, বড় অঙ্কের চেক সম্মান না করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে আতঙ্ক— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি সিদ্ধান্তই পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরা। সেটি হলো, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমকে সরিয়ে দেওয়া এবং পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করা।

অনেকের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এই সিদ্ধান্ত নিতে আরও দেরি করতো, তাহলে ইসলামী ব্যাংকের সংকট আরও গভীর হতে পারত এবং তার প্রভাব দেশের অন্যান্য ব্যাংকেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন খুরশীদ আলম

গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগের পর থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। নিয়োগের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন গ্রাহক সংগঠন এবং ব্যাংকের একাংশ গ্রাহকের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তাদের অভিযোগ ছিল, খুরশীদ আলম অতীতে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের উত্থান ও ইসলামী ব্যাংক দখল প্রক্রিয়ার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। ফলে তাকে চেয়ারম্যান করা মানে অতীতের বিতর্কিত অধ্যায়কে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঈদ-পরবর্তী প্রথম কর্মদিবস থেকেই ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়। ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা বিক্ষোভ, মানববন্ধন এবং চেয়ারম্যান অপসারণের দাবি ক্রমেই জোরালো হতে থাকে। গ্রাহকদের বড় অংশের মধ্যে একটি স্পষ্ট বার্তা তৈরি হয়— খুরশীদ আলম থাকলে তারা ব্যাংকে আস্থা রাখতে পারছেন না।

আড়াই হাজার কোটি টাকা নয়, প্রয়োজন ছিল আস্থা

সংকটের শুরুতে অনেকেই মনে করেছিলেন— এটি কেবল তারল্যের সমস্যা। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম দফায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিশেষ তারল্য সহায়তা দেয়। পরে আরও ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়। অর্থাৎ মাত্র দুই দিনে ৫ হাজার কোটি টাকার সহায়তা পায় ইসলামী ব্যাংক। কিন্তু প্রশ্ন ছিল, টাকা দিলেই কি গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসে? বাস্তবতা বলছে, না। কারণ গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে টাকা তুলছিলেন মূলত আতঙ্ক ও অনাস্থা থেকে। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত উত্তোলন হচ্ছিল। বহু গ্রাহক হিসাব বন্ধ করে অন্য ব্যাংকে চলে যাচ্ছিলেন। অর্থাৎ সংকটের মূল ছিল অর্থের অভাব নয়, বিশ্বাসের অভাব।

ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, কোনও ব্যাংকের সবচেয়ে বড় মূলধন তার আমানত নয়, বরং গ্রাহকের আস্থা। সেই আস্থা একবার নষ্ট হলে হাজার হাজার কোটি টাকার সহায়তাও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারে না।

গ্রাহকদের ভাষা বুঝেছে বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমে তারল্য সহায়তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, শুধুমাত্র নগদ অর্থ সরবরাহ করে সংকট থামানো যাবে না। গ্রাহকরা যে বার্তা দিচ্ছিলেন, সেটি ছিল ভিন্ন। তারা বলছিলেন, সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম এবং তার নেতৃত্বে গঠিত পরিচালনা কাঠামো।

অবশেষে রবিবার (১৪ জুন) রাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় এবং নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে কার্যত বাংলাদেশ ব্যাংক স্বীকার করে নেয় যে, সংকটের কেন্দ্র ছিল আস্থার সংকট এবং সেই সংকটের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন খুরশীদ আলম।

সিদ্ধান্তের পরই বদলাতে শুরু করেছে পরিস্থিতি

পর্ষদ বাতিলের ঘোষণার পর থেকেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইন জানিয়েছেন, কয়েকটি বড় শাখায় হিসাব বন্ধের হার প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে গেছে। নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রাহকদের বড় অংশ এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। অনেকেই অপেক্ষা করছেন নতুন বোর্ড কাদের নিয়ে গঠিত হয় এবং প্রশাসক কী ধরনের পদক্ষেপ নেন তা দেখার জন্য। অর্থাৎ সংকট পুরোপুরি কাটেনি, তবে আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এস আলম অধ্যায়ের দীর্ঘ ছায়া

ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকটকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি নানা বিতর্কে জড়িয়েছে। পরবর্তীকালে বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ, অনিয়ম, খেলাপি ঋণের বিস্তার এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ ব্যাংকটির সুনামকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের নামে-বেনামে নেওয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় ৯৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ফলে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে পরিচালনা পর্ষদ ও নেতৃত্বের প্রশ্নে অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা তৈরি হয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, খুরশীদ আলমকে ঘিরে বিতর্কের পেছনেও কাজ করেছে সেই ঐতিহাসিক ক্ষোভ ও অবিশ্বাস।

এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আস্থা ফিরিয়ে আনা

নতুন প্রশাসক মোহাম্মদ জহির হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের পর বলেছেন, ইসলামী ব্যাংকের জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বোর্ড গঠন করা হবে। তিনি গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা স্বাভাবিক থাকবে এবং উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও কারণ নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বক্তব্য দিয়ে আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। নতুন বোর্ড গঠনে স্বচ্ছতা, বিতর্কমুক্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং গ্রাহকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ— এসব পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে ইসলামী ব্যাংক কত দ্রুত সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে।

পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য শিক্ষা

ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক ঘটনা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। ঘটনাটি প্রমাণ করেছে, ব্যাংকিং ব্যবসার ভিত্তি টাকা নয়, বিশ্বাস। একজন চেয়ারম্যানকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া আস্থাহীনতা কয়েক দিনের মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংককে তারল্য সংকটে ফেলতে পারে। আবার সেই চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তই সংকট প্রশমনের পথ খুলে দিতে পারে। এই বাস্তবতায় অনেকেই বলছেন, ইসলামী ব্যাংককে বাঁচিয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকার সহায়তা নয়; বরং খুরশীদ আলমকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। এখন দেখার বিষয়, নতুন প্রশাসন ও ভবিষ্যৎ পরিচালনা পর্ষদ সেই সুযোগকে কতটা কাজে লাগাতে পারে। কারণ ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় ৩ কোটি গ্রাহক, লাখো প্রবাসী, হাজার হাজার উদ্যোক্তা এবং দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা। আর তাই অনেকের বিশ্বাস— খুরশীদ আলমকে সরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আপাতত ইসলামী ব্যাংককে একটি বড় বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছে। এখন প্রয়োজন সেই আস্থা পুনর্গঠনের দীর্ঘ ও কঠিন পথ সফলভাবে অতিক্রম করা।