মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা শিথিল, ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা শিথিল, ৬০ হাজার কোটি প্রণোদনা

বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কঠোর অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে না এসে এবার অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে কিছুটা সম্প্রসারণমূলক অবস্থান নিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধ (জুলাই-ডিসেম্বর) উপলক্ষে ঘোষিত নতুন মুদ্রানীতিতে (মনিটারি পলিসি স্টেটমেন্ট-এমপিএস) একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য বহাল রাখা হয়েছে, অপরদিকে উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং ঋণপ্রবাহের মন্থর গতি কাটিয়ে উঠতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। অনুষ্ঠানের শুরুতে মুদ্রানীতির মূল প্রবন্ধ (কি-নোট) উপস্থাপন করেন ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান। এসময় ডেপুটি গভর্নর, নির্বাহী পরিচালক, বিভিন্ন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী এবং আর্থিক খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্য

নতুন মুদ্রানীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জুন ২০২৬ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের অন্যতম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, চলতি বছরের ডিসেম্বর শেষে তা ৬ দশমিক ৮ শতাংশে এবং ২০২৭ সালের জুনে ৮ শতাংশে পৌঁছাবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থনীতিবিদদের মতে, গত কয়েক বছরে উচ্চ নীতি সুদহার, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসা, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতির মাধ্যমে সেই স্থবিরতা কাটিয়ে উঠবে— এমন প্রত্যাশা থেকেই এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সরকারি ঋণনির্ভরতা কমানোর ইঙ্গিত

মুদ্রানীতিতে সরকারি খাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি জুন ২০২৫-এ ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। পরে তা ডিসেম্বর ২০২৫-এ বেড়ে ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং জুন ২০২৬-এ ২৫ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছায়। নতুন প্রক্ষেপণে ডিসেম্বর ২০২৬-এ এটি ২১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের জুনে ১৭ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসবে বলে ধারণা করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের ব্যাংকঋণের চাহিদা কমলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ আরও বাড়বে এবং বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

অর্থ সরবরাহে থাকবে সতর্ক সম্প্রসারণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ব্রড মানি বা অর্থ সরবরাহের প্রবৃদ্ধি জুন ২০২৬-এর ১০ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ডিসেম্বর ২০২৬-এ ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জুন ২০২৭-এ ১৩ শতাংশে উন্নীত হবে। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় তারল্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাইলেও অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করতে চায় না। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রিত উপায়ে অর্থ সরবরাহ বাড়ানোর কৌশলই অনুসরণ করা হবে।

বৈদেশিক সম্পদে আশাবাদ

মুদ্রানীতির প্রক্ষেপণে নিট বৈদেশিক সম্পদে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, রফতানি আয় ও প্রবাসী আয়ের উন্নতি এবং বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় এই সূচকে ধারাবাহিক উন্নতি হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

দেশীয় ঋণ ও সম্পদে ভারসাম্যের কৌশল

নিট দেশীয় সম্পদ জুন ২০২৬-এর ৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ডিসেম্বর ২০২৬-এ ৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের জুনে ১২ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে প্রক্ষেপণ দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে মোট দেশীয় ঋণ প্রবৃদ্ধি ১০ থেকে ১০ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে স্থিতিশীল রাখা হবে। এর মাধ্যমে ঋণ সম্প্রসারণ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ— দুই লক্ষ্যেই ভারসাম্য বজায় রাখতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

রিজার্ভ মানি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার সক্ষমতা

মুদ্রানীতি অনুযায়ী, রিজার্ভ মানি প্রবৃদ্ধি জুন ২০২৬-এর ১২ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ডিসেম্বর ২০২৬-এ ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জুন ২০২৭-এ ১১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এছাড়া মানি মাল্টিপ্লায়ার ৫ দশমিক ২১ থেকে বেড়ে ডিসেম্বর ২০২৬-এ ৫ দশমিক ৩৫ এবং জুন ২০২৭-এ ৫ দশমিক ৩০ থাকবে বলে ধারণা করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানতের বিপরীতে ঋণ সৃষ্টির সক্ষমতা মোটামুটি স্থিতিশীল থাকবে।

কঠোরতা থেকে ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রানীতির পথে

সামগ্রিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক এখনও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে অর্থনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে উৎপাদন ও বিনিয়োগে গতি ফেরাতে ধীরে ধীরে প্রবৃদ্ধিবান্ধব অবস্থানে যাচ্ছে। ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা কর্মসূচিও সেই কৌশলেরই অংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি আরও কমে এলে, সুদের চাপ কিছুটা শিথিল হলে এবং ব্যবসায়িক আস্থা ফিরে এলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনে গতি আসবে। সেই সঙ্গে ঋণপ্রবাহও বাড়বে, যা আগামী এক বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি দিতে পারে।