দেশের ব্যাংকিং খাতে চলমান সংকটের টেকসই সমাধান না হলে অর্থনীতির ধস ঠেকানো কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, “ব্যাংক খাতের সংকট নিরসনে শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও জরুরি।”
সেমিনারে বক্তব্য
শনিবার (১৬ মে) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘দেশের ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়; প্রেক্ষিত ইসলামী ব্যাংকিং খাত: জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের আয়োজনে এ সেমিনারে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক, অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
হোসেন জিল্লুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, “যারা ব্যাংক খাতে সমস্যা তৈরি করেছে, তাদের আবার ফিরিয়ে আনতে আইনে নতুন ধারা কেন যুক্ত করা হচ্ছে—এ প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।” তিনি মনে করেন, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট এবং এ সংকট মোকাবিলায় শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
অর্থনীতির ছয় সংকট
বক্তব্যে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ছয়টি বড় সমস্যা তুলে ধরেন হোসেন জিল্লুর রহমান। তার মতে— দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে; কলুষিত নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করেছে; আমানতকারীরা নীরবে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন; অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে; বিনিয়োগ কমছে, বাড়ছে বেকারত্ব; দেশের সাম্প্রতিক পরিবর্তন সংকট সমাধানের সুযোগ তৈরি করেছে ও সংকটের টেকসই সমাধান নৈতিকতার উচ্চ মানদণ্ডে করতে হবে।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, “অনেক আমানতকারী ব্যাংক থেকে নিজেদের জমানো টাকা তুলতে পারছেন না। গ্রাহক আস্থা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের জায়গায় আরও শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে হবে। পাশাপাশি বেকারত্ব সমস্যার সমাধান না হলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব
আলোচনায় ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া ব্যাংক খাতকে সঠিক পথে ফেরানো সম্ভব নয়। ব্যাংক খাতে যেসব লুটপাট হয়েছে, তার পূর্ণ হিসাব বের করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “ব্যাংক খাত অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই খাতে লুটপাটের ফলেই আজ অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে।” তিনি অভিযোগ করেন, ব্যাংক দখল ও অনিয়মের ঘটনাগুলো এতটাই নাটকীয় যে তা নিয়ে থ্রিলার সিনেমা নির্মাণ সম্ভব।
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে উদ্বেগ
সেমিনারে বক্তব্য দেওয়া ইসলামী ব্যাংকের কয়েকজন গ্রাহক ও পেশাজীবী অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি দখল করা হয়েছিল। এ জন্য আগে থেকেই পরিকল্পিত পরিবেশ তৈরি করা হয় বলেও দাবি করেন তারা।
তাদের ভাষ্য, মাত্র দুই শতাংশ শেয়ার দিয়ে একটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ প্রশ্নবিদ্ধ। এ বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বক্তারা। তারা সতর্ক করে বলেন, “ইসলামী ব্যাংকে আবার কোনও ধরনের সংকট তৈরি হলে এবার গ্রাহকেরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।”
সেমিনারে বক্তারা ব্যাংক খাতের সংকট সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সুশাসনের ওপর জোর দেন। তারা বলেন, টেকসই সমাধান না হলে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার।



