কর্জে হাসানা ব্যাংক: ইসলামি অর্থব্যবস্থার বিকল্প কাঠামো
কর্জে হাসানা ব্যাংক: ইসলামি অর্থব্যবস্থার বিকল্প কাঠামো

অধ্যাপক এম কবির হাসান তার কলামে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করে কর্জে হাসানা ব্যাংক নামে একটি বিকল্প আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি যুক্তি দেখান যে প্রচলিত ইসলামি ব্যাংকিং মূলত সুদভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের একটি শরিয়াহসম্মত প্রতিরূপ মাত্র, যেখানে মুরাবাহা ও ইজারার মতো পণ্য আনুষ্ঠানিকভাবে শরিয়াহ মেনে চললেও কার্যত প্রচলিত ব্যাংকের মতোই আর্থিক ফলাফল দেয়।

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সীমাবদ্ধতা

প্রায় সাত দশকের পথপরিক্রমায় ইসলামি ব্যাংকিং একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প হিসেবেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এর সাফল্য মাপা হয়েছে প্রচলিত ব্যাংকের কতটা কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছে, সেই মাপকাঠিতে। অধ্যাপক হাসান মনে করেন, ইসলামি সভ্যতা যদি স্বাধীনভাবে নিজস্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়তে পারত, তবে তার কাঠামো হতো সম্পূর্ণ ভিন্ন—সুবিচার, সমতা ও অন্তর্ভুক্তির মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে। সেই কাঠামোর দুই স্তম্ভ হলো অংশীদারিভিত্তিক ব্যবসা এবং কর্জে হাসানা।

কর্জে হাসানার ঐতিহাসিক গুরুত্ব

কর্জে হাসানা হলো মুনাফাবিহীন, সুদমুক্ত ঋণ, যা ইসলামে একটি পুণ্যের কাজ হিসেবে বিবেচিত। পবিত্র কোরআনে একে 'উত্তম ঋণ' বলা হয়েছে (সুরা আল-বাকারা ২:২৪৫, সুরা আল-হাদিদ ৫৭:১১)। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্জে হাসানার সওয়াবকে সদাকার চেয়েও বেশি বলেছেন (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২৪৩১)। শতাব্দীর পর শতাব্দী এটি মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক সংহতির মাধ্যম ছিল। ১৯৬০-এর দশকে মালয়েশিয়ার তাবুং হাজি, মিসরের মিট ঘমর সেভিংস ব্যাংক ও নাসের সোশ্যাল ব্যাংক কর্জে হাসানাকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। কিন্তু বাণিজ্যিক ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এটি প্রান্তিক হয়ে পড়ে, কারণ এটি সরাসরি রাজস্ব উৎপন্ন করে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অধ্যাপক হাসানের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২১টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণে কর্জে হাসানা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রস্তাবিত কর্জে হাসানা ব্যাংকের কাঠামো

প্রস্তাবিত 'কর্জে হাসানা ব্যাংক' একটি ওয়াক্ফভিত্তিক, অলাভজনক ও সমবায়ধর্মী বিশেষায়িত ব্যাংক। এর মূল পুঁজি আসবে সম্পদশালী মুসলিম ব্যক্তিদের ওয়াক্ফের মাধ্যমে গঠিত একটি ওয়াক্ফ-ফান্ড থেকে, যা পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এই পুঁজি আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সুরক্ষা দেবে, তবে এর বিনিয়োগ আয় আসবে ঋণভিত্তিক লেনদেন থেকে নয়; বরং বৈদেশিক মুদ্রাবাণিজ্য, ভূসম্পত্তি বা অন্যান্য উৎপাদনশীল বিনিয়োগ থেকে।

ব্যাংকের তহবিলের উৎস হবে: ১. ওয়াক্ফ তহবিল (প্রাথমিক পুঁজিসহ), ২. কর্জে হাসানা তহবিল, ৩. সাধারণ দান-সদকা, ৪. ক্যাশ ওয়াক্ফ। আমানত গ্রহণ করা হবে দুই ধরনের অ্যাকাউন্টে—কর্জে হাসানা (আল-ওয়াদিয়া) ও মেয়াদি ক্যাশ ওয়াক্ফ; কোনো ক্ষেত্রেই মুনাফা প্রদান করা হবে না।

ঋণ বিতরণ ও তিন স্তরের কাঠামো

ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি মুনাফাবিহীন কর্জ দেবে, যেখানে কেবল প্রশাসনিক ব্যয় কর্জগ্রহীতাকে বহন করতে হবে। এই অতিরিক্ত ব্যয় রিবা হিসেবে গণ্য হবে না, কারণ ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নের একটি বড় অংশও এ ধরনের লাভবিহীন ঋণের আওতাভুক্ত, যেখানে প্রশাসনিক ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকে।

ঋণ বিতরণ হবে তিন স্তরে: ১. দরিদ্র ও অসচ্ছলদের জন্য অফেরতযোগ্য সহায়তা (বেনেভোলেন্ট ফান্ড থেকে), ২. নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্য আংশিক অফেরতযোগ্য কর্জে হাসানা (গ্রুপ গ্যারান্টি ও বেনেভোলেন্ট ফান্ডের সমন্বয়ে), ৩. মধ্যবিত্তদের জন্য স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পূর্ণ ফেরতযোগ্য কর্জে হাসানা।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব

কর্জে হাসানা ব্যাংকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো সামষ্টিক অর্থনীতিতে এর গভীর প্রভাব। ব্যাংকিং ব্যবস্থার মতো এখানেও অর্থ সৃষ্টির ক্ষমতা থাকবে—আমানতের একটি অংশ রিজার্ভ রেখে বাকি অংশ কর্জ হিসেবে বিতরণ করলে নতুন আমানত ও ক্রয়ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১০% রিজার্ভ অনুপাত থাকলে প্রাথমিক ১,০০০ টাকা আমানত থেকে তাত্ত্বিকভাবে সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত আমানত সৃষ্টি হতে পারে। তবে পার্থক্য হলো, এই কর্জের ওপর কোনো মুনাফা বা সুযোগ ব্যয় আরোপ করা হয় না, কেবল প্রকৃত প্রশাসনিক ব্যয় ধার্য করা হয়। ফলে অর্থ সৃষ্টি শোষণমূলক নয়, বরং সামাজিক সংহতি ও ন্যায়ভিত্তিক।

ব্যাংকটি ধনীদের জন্য নয়; তারা পুঁজিবাজার ও অংশীদারিভিত্তিক বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রয়োজন পূরণ করবেন। বরং এর লক্ষ্য দরিদ্র, অসচ্ছল ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তহবিলের সিংহভাগ মধ্যবিত্তদের মধ্যে প্রবাহিত হবে, পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট অংশ দরিদ্র ও অসচ্ছলদের মধ্যে বণ্টিত হবে, ফলে এটি সম্পদ পুনর্বণ্টনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।

ব্যবহারক্ষেত্র ও কর্পোরেট নীতি

কর্জের ব্যবহারক্ষেত্র থাকবে নিয়ন্ত্রিত: মানবসম্পদ উন্নয়ন (শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ), উৎপাদন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাত, জরুরি ভোগ ও সামাজিক সুরক্ষা (স্বাস্থ্য, চিকিৎসা), এবং উৎপাদন-সহায়ক অবকাঠামো ও সেবা খাত।

কর্পোরেট নীতিতে বড় পার্থক্য থাকবে—এখানে ব্যবস্থাপকরা বেতনভুক্ত হবেন এবং তাদের প্রধান লক্ষ্য হবে মুনাফা অর্জন নয়, বরং সেবার মানোন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠানের পরিসর সম্প্রসারণ। ওয়াক্ফভিত্তিক কাঠামোয় ব্যবস্থাপনা, আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তুলনামূলকভাবে হ্রাস পায়।

অধ্যাপক হাসান মনে করেন, কর্জে হাসানা ব্যাংক ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সব সমস্যার সমাধান নয়, তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—আমরা কি শুধু প্রচলিত ব্যাংকের শরিয়াহসম্মত রূপেই সন্তুষ্ট থাকব, নাকি ইসলামি অর্থব্যবস্থার নিজস্ব মূল্যবোধের ভিত্তিতে আলাদা প্রতিষ্ঠান গড়ার সাহস দেখাব?