বাংলাদেশ ব্যাংক বুধবার চারটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর অবস্থা থেকে কার্যকর হতে তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী।
তিনি আরও জানান, প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত শর্ত তিন মাসের মধ্যে পূরণ করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাংক রেজোলিউশন আইন, ২০২৬ অনুযায়ী পুনর্বাসন বা পুনর্গঠন, একীভূতকরণ বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্যাংক রেজোলিউশন আইনের আওতায় সময় বেঁধে দেওয়া
বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ব্যাংক রেজোলিউশন আইন, ২০২৬-এর ১৫ ধারা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদের প্রতিশ্রুতি বিবেচনা করে এই সময় দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো দ্রুত সংশোধনমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে সাধারণ ও ব্যক্তি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিন মাস সময় পাওয়া চারটি প্রতিষ্ঠান হলো: প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফসি) এবং প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড।
দীর্ঘদিনের তারল্য সংকট ও খেলাপি ঋণের প্রভাব
দীর্ঘদিনের তারল্য সংকট, উচ্চ খেলাপি ঋণ ও মূলধন স্বল্পতার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক গ্রাহক সময়মতো তাদের জমা ফেরত পাচ্ছেন না। এতে আমানতকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী তিন মাসের মধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ও স্পনসর শেয়ারহোল্ডারদের নতুন মূলধন বিনিয়োগ করে মূলধন ঘাটতি পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় তারল্য নিশ্চিত করতে হবে যাতে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়।
নিজস্ব সম্পদ বিক্রি ও খেলাপি ঋণ আদায়ের নির্দেশ
দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব সম্পদ ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে নগদ অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। এ ছাড়া বকেয়া ঋণ আদায়ে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, খেলাপি ঋণ পুনর্নির্ধারণ, পুনর্গঠন বা নিষ্পত্তির মাধ্যমে শ্রেণিকৃত ঋণের হার গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। এই পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটিয়ে আমানতকারীদের দায় নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত তিন মাসের মধ্যে এক বা একাধিক শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হলে ব্যাংক রেজোলিউশন বিভাগ ব্যাংক রেজোলিউশন আইন, ২০২৬ অনুযায়ী অবিলম্বে পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করবে। এক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন, নতুন বিনিয়োগকারী আনা, অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করা, সম্পদ বিক্রি, ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন বা আইন অনুযায়ী অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতামত: জনআস্থা ফেরানোর উদ্যোগ
বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা ফেরানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। অতীতে সংকটে পড়া অনেক ফাইন্যান্স কোম্পানির আমানতকারীরা বছরের পর বছর তাদের টাকা ফেরত পাননি। ফলে পুরো নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল।
নতুন আইনের অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদকে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে জবাবদিহির আওতায় আনছে। অর্থাৎ শুধু সময় দেওয়া নয়, বরং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট বার্তাও দেওয়া হয়েছে।



