চাঁদপুরের হাইমচরে এজেন্ট ব্যাংকিং জালিয়াতি: গ্রাহকদের নামে ঋণ, অর্থ আত্মসাৎ ও মামলার অভিযোগ
চাঁদপুরে এজেন্ট ব্যাংকিং জালিয়াতি: গ্রাহকদের নামে ঋণ ও মামলা

চাঁদপুরের হাইমচরে এজেন্ট ব্যাংকিং জালিয়াতি: গ্রাহকদের নামে ঋণ, অর্থ আত্মসাৎ ও মামলার অভিযোগ

চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলায় একটি বেসরকারি ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং শাখায় গ্রাহকদের তথ্য জালিয়াতি করে প্রতারণামূলক ঋণ প্রদান, অর্থ আত্মসাৎ ও আইনি হয়রানির ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার দুপুরে চাঁদপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা এই অভিযোগ তুলে ধরেন এবং দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের অর্থ ফেরত ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান।

প্রতারণার কৌশল ও অভিযুক্তদের তালিকা

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা জানান, হাইমচর উপজেলার দক্ষিণ আলগী ইউনিয়নের চরভাঙ্গা গ্রামের তাজুল ইসলাম কবিরাজ, তাঁর স্বজন আছমা আক্তার ও ভাই মো. আলাউদ্দিন কবিরাজের নিয়ন্ত্রণাধীন ইসলামী ব্যাংকের একটি এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। শাখার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্থানীয় প্রায় অর্ধশত ব্যক্তির কাছ থেকে ডিপিএস হিসাব খোলার কথা বলে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, টিপসই ও স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। এরপর ইসলামী ব্যাংকের চাঁদপুর ও ফরিদগঞ্জ শাখা থেকে এসব গ্রাহকের নামে আনুমানিক দুই কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়।

নূর–ই–আলম নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, ইসলামী ব্যাংক চাঁদপুর শাখার একসময়ের কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম তাঁর শ্যালিকা আসমা আক্তারের নামে হাইমচরে ওই ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং শাখা খোলেন। শাখাটি মূলত পরিচালনা করতেন তাজুল ইসলাম ও তাঁর ভাই আলাউদ্দিন কবিরাজ। নেপথ্যে ছিলেন ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা আজাদ, কবির হোসেন, ওমর আইয়ুব, নূর–ই–আলমসহ আরও কয়েকজন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভুক্তভোগীদের বক্তব্য ও আইনি জটিলতা

হাইমচর ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা কাদের সরদার পেশায় ট্রলারচালক। তিনি বলেন, ‘তিন মাস আগে জানতে পারি আমার নামে ব্যাংক লোন রয়েছে। এ কাজে আমার অগোচরে ডিপিএসের নাম করে এনআইডি কার্ড ব্যবহার করা হলেও আমি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। এলাকার বাসিন্দা ও চাঁদপুর ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম কবিরাজ আমাকে ফাঁসিয়েছে। সে আমার নামে ব্যাংকে ভুয়া কাগজ তৈরি করে তিন লাখ টাকা লোন নেয়, যা বর্তমানে সুদে–আসলে ৩ লাখ ৪১ হাজার ৬০০ টাকা হয়েছে। এ ঘটনায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দায়ের করা মামলায় আমি এখন পলাতক আসামি।’

একই ধরনের অভিযোগ করেন শাহজালাল সরকার, সোহেল রানা, আমানউল্লাহ সর্দার, বারেক সর্দার ও শাহজালাল সর্দার নামে স্থানীয় আরও কয়েকজন। তাঁরা হাইমচর উপজেলার নীলকমল ইউনিয়নের মধ্যচর এলাকার বাসিন্দা। শাহজালাল সরকার জানান, ডিপিএসের নাম করে তাঁর কাছ থেকে এনআইডি কার্ডের ফটোকপি নেওয়া হয়। তাঁর নামে নেওয়া লোন এখন সুদে–আসলে ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি নিরীহ লোক। কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করি। আমি এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’

ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের অভিযোগ, তাঁদের তথ্য ব্যবহার করে অজ্ঞাতে একাধিক ব্যাংক হিসাব খোলা হয়, চেকবই ইস্যু করা হয় এবং পরে তাঁদের নামে ঋণ অনুমোদন করা হয়। কিন্তু ওই ঋণের অর্থ গ্রাহকদের হাতে না দিয়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আত্মসাৎ করেছেন। পুরো প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছিল বলেও দাবি ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের।

মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছে। মামলার বিষয়ে কোনো নোটিশ না দিয়েই অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে, কয়েকজনকে ইতিমধ্যে কারাভোগ করতে হয়েছে। পরে তাঁরা বাধ্য হয়ে ঋণের আংশিক অর্থ আদালতে জমা দিয়ে জামিনে মুক্তি পান। অথচ আসামিদের কেউই ঋণ গ্রহণের বিষয়ে অবগত ছিলেন না বলে দাবি করেন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মামলার পুরো প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের অজ্ঞাতে ভুয়া তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে এবং আদালতেও বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়েছে। এতে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চেক–সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে আইনি নোটিশ প্রদান বাধ্যতামূলক হলেও ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা কেউই এমন কোনো নোটিশ পাননি। এ ছাড়া ঋণের অর্থ গ্রহণ না করায় তাঁদের বিরুদ্ধে দায় আরোপ আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তাঁরা দাবি করেন।

অভিযুক্তের বক্তব্য ও ব্যাংকের প্রতিক্রিয়া

অভিযোগের বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের চাঁদপুর শাখার সাবেক ফিল্ড অফিসার অভিযুক্ত তাজুল ইসলাম কবিরাজ বলেন, ‘আমি গত জানুয়ারি মাসে ব্যাংক থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করি। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ গ্রাহকেরা করছেন, তা আমি মেনে নেব না। কারণ, গ্রাহকদের যখন লোন দেওয়া হয়েছে, তখন আমি ফরিদগঞ্জ শাখায় কর্মরত ছিলাম। এখন আমি আর চাকরি করছি না। আর যাঁরা টাকা নিয়েছেন, ব্যাংক তাঁদের বিষয়ে জবাব দেবে।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মামলার বাদী ইসলামী ব্যাংকের প্রতিনিধি মো. আশরাফুজ্জামান ও ইসলামী ব্যাংকের চাঁদপুর শাখার ব্যবস্থাপক সাখাওয়াত হোসেনের একাধিক মুঠোফোন নম্বরে কল করা হলে সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়।

আইনজীবীর মন্তব্য ও ভবিষ্যৎ দাবি

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হামিদুল মিসবাহ বলেন, নিরীহ গ্রাহকদের তথ্য ব্যবহার করে এ ধরনের প্রতারণা শুধু আর্থিক অপরাধ নয়, এটি মানুষের জীবনে মারাত্মক দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। অনেকেই বিনা অপরাধে কারাভোগ করেছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা।

ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা দাবি করেন, একই কৌশলে একই ব্যাংকের অন্য শাখায়ও অনুরূপ প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। এতে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তাঁরা পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।