প্রিমিয়ার ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার: তারল্য সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ
প্রিমিয়ার ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার

প্রিমিয়ার ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার: তারল্য সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ

বেসরকারি খাতের প্রিমিয়ার ব্যাংকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুদিন আগে এই অর্থ সহায়তা প্রদান করে। বড় কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে বিপুল অঙ্কের আমানত তুলে নেওয়ায় ব্যাংকটিতে জরুরি তারল্য সংকটের সৃষ্টি হয়। এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ এই ধার দিতে বাধ্য হয়।

সহায়তার বিস্তারিত বিবরণ

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র থেকে জানা গেছে, পাঁচ হাজার কোটি টাকার এই সহায়তার মধ্যে এক হাজার কোটি টাকা সরাসরি নগদ আকারে দেওয়া হয়েছে। বাকি চার হাজার কোটি টাকা বন্ডের মাধ্যমে প্রদান করা হয়েছে। মূলত আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজার থেকে প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রিমিয়ার ব্যাংককে এই বিশেষ সুবিধা দিতে হয়েছে।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সহায়তা ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহক ও শেয়ারধারীদের আস্থা আরও বৃদ্ধি করবে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, "আগের আমলের তুলনায় ব্যাংকটি এখন অনেক ভালো চলছে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কোনো অনিয়ম করছে না, অনিয়মের সুযোগও দিচ্ছে না।"

ধার প্রদানের পদ্ধতি ও শর্তাবলি

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের ১৬ (৪) (ডি) এবং ১৭ (১) (বি) ধারা অনুযায়ী, ৯০ দিন মেয়াদে সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে এই অর্থ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকিং পরিভাষায় একে 'ওভারনাইট-ওডি' সুবিধা বলা হয়। এই ধারের বিপরীতে ব্যাংকটি সমমূল্যের 'ডিমান্ড প্রমিসরি নোট' জমা দিয়েছে। শর্ত অনুযায়ী, কোনো কারণে ব্যাংকটি অবসায়িত বা দেউলিয়া হলে সম্পদ বিক্রি করে সবার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পাওনা পরিশোধ করতে হবে।

এর আগে শরিয়াভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকসহ একীভূত হওয়ার তালিকায় থাকা পাঁচটি ব্যাংকও একইভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থসহায়তা নিয়েছিল।

সংকটের পেছনের কারণ

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রিমিয়ার ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন এইচ বি এম ইকবাল। দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকটির পর্ষদে তাঁর পরিবারের সদস্যদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। অভিযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জের একটি শাখাসহ বেশ কিছু শাখা থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করায় ব্যাংকটি আগে থেকেই অভ্যন্তরীণ সংকটে ছিল।

সম্প্রতি কয়েকটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান তাদের আমানত তুলে নিলে ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। ফলে ব্যাংকটি সিআরআর (বিধিবদ্ধ নগদ জমা) ও এসএলআর (সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদ) সংরক্ষণেও ব্যর্থ হয়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাংককে তাদের দায়ের ৪ শতাংশ সিআরআর এবং ১৩ শতাংশ এসএলআর হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, "কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে টাকা তুলে নেওয়ায় ব্যাংকটি তারল্য–সংকটে পড়েছিল। এই সংকট প্রকট হলে পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ছিল। সেই ঝুঁকি এড়াতেই এই ধার দেওয়া হয়েছে। তবে ধারের বড় অংশই বন্ডের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে, নগদ দেওয়া হয়েছে মাত্র এক হাজার কোটি টাকা।"

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এইচ বি এম ইকবালের সময় অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংকটির এমন পরিস্থিতি হয়েছে। এ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকালীন ভাইস চেয়ারম্যান আরিফুর রহমানকে চেয়ারম্যান করে গত বছরের আগস্টে পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।