এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে বাজেট সহায়তা হিসেবে ১০০ কোটি ডলারের ঋণ পাওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রবিবার (১৪ জুন) দেশের গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে, যা গত ৪৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
রিজার্ভের ঊর্ধ্বগতি
এর আগে কয়েক দফা রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের ঘর স্পর্শ করলেও এই সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। গত বৃহস্পতিবার রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে এতে যোগ হয়েছে ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারিত বিপিএম৬ হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করল।
পতনের ধারা পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২১ সালের আগস্টে সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক লেনদেনের চাপ এবং অর্থপাচারের অভিযোগসহ নানা কারণে রিজার্ভ দ্রুত কমতে শুরু করে।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় গ্রস রিজার্ভ নেমে এসেছিল ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল মাত্র ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। সেই নিম্নমুখী অবস্থান থেকে গত প্রায় দুই বছরে রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালের জুন থেকে আইএমএফের নির্দেশনা অনুযায়ী বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভের হিসাব প্রকাশ শুরু করে। সে সময় এ হিসাব অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। আর রবিবার তা ৩১ বিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছেছে।
রেমিট্যান্সে স্বস্তি
রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবাহকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১০ জুন পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৫ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার বা ১৯ দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি। এর আগের অর্থবছরেও রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ।
রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক ধারা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের বাজেট সহায়তার অর্থ একত্রে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ কমাতে সহায়তা করেছে। ফলে রিজার্ভে স্থিতিশীলতা ফিরেছে এবং ডলারের সরবরাহ পরিস্থিতিও আগের তুলনায় স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে।
২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ অবস্থান
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২২ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দেশের গ্রস রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যায়। এরপর টানা নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত থেকে তা ২০২৪ সালের আগস্টে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন বছর পর আবারও রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠে ৩৫ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রিজার্ভের এ পুনরুদ্ধার দেশের বহিঃখাতের স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক বার্তা দিলেও আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে আগামী দিনগুলোতে রিজার্ভ ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ অব্যাহত থাকবে।



