বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি: ৪২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার কৃষিপণ্য আমদানি ও শুল্ক সুবিধা
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তিতে ৪২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার কৃষিপণ্য আমদানি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত, ৪২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার কৃষিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি

বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত নতুন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সোমবার স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের কৃষিপণ্য আমদানির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪২ হাজার ৭০০ কোটি টাকারও বেশি (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে)।

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিসংখ্যান ও কৃষিপণ্যের বিশদ বিবরণ

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার, যার মধ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি করে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য এবং আমদানি করে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। নতুন চুক্তিতে কৃষিপণ্যের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে:

  • আগামী পাঁচ বছরে প্রতি বছর কমপক্ষে ৭ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানি
  • এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১২৫ কোটি ডলার বা ২৬ লাখ মেট্রিক টন (যেটি কম) মূল্যের সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য
  • তুলা আমদানির পরিকল্পনা

উড়োজাহাজ, জ্বালানি ও সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বৃদ্ধির অঙ্গীকার

চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ মার্কিন উড়োজাহাজ, জ্বালানি এবং সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে সম্মত হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির তৈরি ১৪টি বেসামরিক উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করছে, পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত উড়োজাহাজ ক্রয়ের বিকল্পও রাখা হয়েছে। জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ (এলএনজি) বিভিন্ন জ্বালানি পণ্য দীর্ঘমেয়াদে আমদানির উদ্যোগ নেবে, যার মধ্যে ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জ্বালানি পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

শুল্কমুক্ত সুবিধা ও পণ্যের তালিকা

যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা দেবে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) প্রকাশিত তালিকায় দেড় হাজারের বেশি পণ্য রয়েছে, যেগুলো বাংলাদেশের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধায় প্রবেশ করবে। এই পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  1. রাসায়নিক দ্রব্য ও চিকিত্সা যন্ত্রপাতি
  2. যন্ত্র, মোটরযান ও যন্ত্রাংশ
  3. তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সরঞ্জাম
  4. সয়াজাত ও দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, হাঁস-মুরগি
  5. বাদাম ও বিভিন্ন ফল

চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে উত্পন্ন পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্কহার কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তৈরি পোশাক রপ্তানি করলে তাতে পালটা শুল্ক আরোপ হবে না এমন ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার ও শর্তাবলি

চুক্তিতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বিদ্যমান অশুল্ক বাধা কমানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল মোটরযান নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী নির্মিত যানবাহন গ্রহণ করবে এবং চিকিত্সা যন্ত্রপাতি ও ওষুধের ক্ষেত্রে এফডিএ-এর সনদের স্বীকৃতি দেবে। ডিজিটাল বাণিজ্য, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সংস্কার, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, শ্রম অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অঙ্গীকার করেছে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক শূন্য সম্পূরক শুল্কে মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার পাবে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের ১ লাখ কোটি টাকার ওপরে রপ্তানি হয় মার্কিন বাজারে, যা অতি সংবেদনশীল ও প্রয়োজনীয়। চুক্তি থেকে প্রয়োজনে অ্যাপ্রোপ্রিয়েট নোটিশ দিয়ে বের হয়ে আসার সুযোগ রাখা হয়েছে।

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকে ২৫০০ আইটেমের ওপর ডিউটি ফ্রি বেনিফিট দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ফার্মাসিউটিক্যালস, প্লাস্টিক পণ্য, উড়োজাহাজের যন্ত্রপাতি ও প্লাইউড বোর্ড অন্তর্ভুক্ত। দুই দেশ নিজেদের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত চুক্তিটি চূড়ান্ত করবে এবং কার্যকর হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবে।