অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (এএইউবি) একদল শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক ড্রোন প্রতিযোগিতা ‘ডিজাইন বিল্ড ফ্লাই’ (ডিবিএফ)-এ বিশ্বে ৩৪তম স্থান অর্জন করেছে। এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে তাদের অবস্থান চতুর্থ। আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব অ্যারোনটিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনটিকস (এআইএএ) প্রতি বছর স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এবারের প্রতিযোগিতায় বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭৫টি দল অংশ নেয়।
প্রতিযোগিতার ধাপ
প্রতিযোগিতাটি তিনটি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়: নকশা, নির্মাণ ও উড্ডয়ন। প্রথম ধাপে প্রতিযোগীদের একটি প্রস্তাবনা জমা দিতে হয়, যাকে ‘প্রোপোজাল ফেজ’ বলা হয়। দ্বিতীয় ধাপে তারা তাদের নকশা অনুযায়ী ড্রোন নির্মাণ করে। তৃতীয় ও চূড়ান্ত ধাপে নিজেদের তৈরি ড্রোন আকাশে ওড়াতে হয় এবং চারটি মিশন সম্পন্ন করতে হয়। তিন ধাপের স্কোর মিলিয়ে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করা হয়।
এয়ারবোর্ন ফিনিকসের যাত্রা
এএইউবি এবার দ্বিতীয়বারের মতো এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। ২৫ সদস্যের দলটির নাম ‘এয়ারবোর্ন ফিনিকস’। নেতৃত্ব দেন আবদুল্লাহ আল আজিজ, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, দলটি আগে থেকেই বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিত। ২০২৪ সালে তারা ডিবিএফে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এই যাত্রা কঠিন ছিল। এ সময় ‘ম্যাজিক ম্যান’ হয়ে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এয়ার কমডোর সাইফুর রহমান। তাঁর সহযোগিতায় গতবার প্রথমবারের মতো অংশ নেয় দলটি। এবার তিনি দলের ‘ফ্যাকাল্টি অ্যাডভাইজার’ ছিলেন।
নির্মাণ ও প্রস্তুতি
এআইএএ ২০২৫-২৬ বছরের রুল বুক প্রকাশ করে গত আগস্টে। এয়ারবোর্ন ফিনিকস অক্টোবরে প্রস্তাব জমা দেয়। প্রথম ধাপের ফলাফলে ১২তম হয় দলটি। এরপর শুরু হয় নির্মাণপর্ব। ড্রোনের ওজন কম রাখতে কার্বন ফাইবার ব্যবহার করা হয়। দলের সদস্যরা দিনে ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টাও ল্যাবে কাটিয়েছেন। তারা ড্রোনের চারটি প্রোটোটাইপ নির্মাণ করেন। প্রথম দুটি প্রোটোটাইপ দিয়ে দেশে উড্ডয়ন পরীক্ষা চালানো হয়। ২০টি উড্ডয়নের মধ্যে ১৩টিতে সফল হন তারা। এ কাজে রানওয়ে ব্যবহারের জন্য সহযোগিতা করে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী।
চূড়ান্ত পর্ব
এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে দুটি আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকেল (ইউএভি) নিয়ে দলের ১১ জন চূড়ান্ত পর্বে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে যান। কানসাস অঙ্গরাজ্যের উইচিটায় ১৬ থেকে ১৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় চূড়ান্ত ধাপের প্রতিযোগিতা। এই ধাপে চারটি মিশনের তিনটি সফলভাবে সম্পন্ন করে এয়ারবোর্ন ফিনিকস। সব কটি মিশনে ড্রোনের দ্রুত উড্ডয়ন ও ভারবহন ক্ষমতা যাচাই করা হয়। চতুর্থ মিশনে একটি কাপড়ের ব্যানার ওড়ানোর কাজ ছিল, কিন্তু ব্যানারটি জড়িয়ে যায়। দলনেতা আজিজ বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুনদের বরণ করতে ‘‘ওয়েলকাম ফ্রেশার্স’’ লিখে ব্যানার উড়িয়েছিলাম। কিন্তু প্রতিযোগিতায় ব্যানারটা জড়িয়ে গেল। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। আমরা শেষ মিশনটা ঠিকঠাক করতে পারলে সাত কিংবা আট নম্বরে থাকতে পারতাম।’
প্রয়োজন পৃষ্ঠপোষকতা
ড্রোন নির্মাণে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পেতে বেগ পেতে হয়েছে দলকে। দলের উপদেষ্টা সাইফুর রহমান বলেন, ‘অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের লজিস্টিক নিয়ে তুলনামূলক বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। আমাদের হয়তো একটা জিনিস দরকার, সেটা বাইরের দেশ থেকে এনে হাতে পেতে অনেক সময় লেগে যায়। আবার আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টি লালমনিরহাটে। ফলে ঢাকাতে যেটা পাওয়া যায়, সেটি হাতে পেতেও কিছুটা সময়ের দরকার হয়। এটা শিক্ষার্থীদের ওপর একটা বাড়তি চাপ তৈরি করে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এয়ার ভাইস মার্শাল এম মোস্তাফিজুর রহমান এই প্রতিবন্ধকতা সামাল দিতে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেছেন বলে জানান তিনি।
সামিয়া ইসলাম দলের ‘টেকনিক্যাল রাইটিং’–এর প্রধান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে দলের সঙ্গী ছিলেন। অন্য প্রতিযোগীদের দেখে তাঁর উপলব্ধি, সুযোগ-সুবিধায় কিছুটা পিছিয়ে আছেন তারা। সামিয়া বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টি নতুন। এখানের ল্যাব ফ্যাসিলিটি বাইরের দেশের মতো নয়। আমরা কিছুটা পিছিয়ে আছি।’ তিনি জানান, এ ক্ষেত্রে সরকার ‘স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ’ প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। এতে তারা বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।



