বিশ্বকাপের গল্প শুধু খেলার নয়; এটি মানুষের ভালোবাসা, ত্যাগ ও অমরত্বের গল্প। ব্রাজিলের ক্লোভিস আকোস্তা ফার্নান্দেজ, যিনি 'গাউচো দা কোপা' বা 'বিশ্বকাপের রাখাল' নামে পরিচিত, তাঁর জীবনই এর উদাহরণ। ১৯৯০ বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিল দলের সঙ্গী এই ব্যবসায়ী গ্যালারিতে হলুদ জার্সি পরে বিশ্বকাপ ট্রফি আগলে রাখতেন সন্তানের আদরে। গুগল-ফেসবুকে তাঁর ছবি ভাইরাল ছিল। কিন্তু ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ব্রাজিল জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে হেরে যাওয়ার পর সেদিন তাঁর বিষাদগ্রস্ত মুখ 'ব্রাজিলের সবচেয়ে দুঃখী মানুষ' হিসেবে পরিচিত হয়।
ক্লোভিসের অমর মুহূর্ত
পরাজয়ের পর অশ্রুসিক্ত ক্লোভিস পাশের এক জার্মান সমর্থকের হাতে ট্রফি তুলে দিয়ে বলেন, 'ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যাও। এটা তোমাদের প্রাপ্য।' জার্মানি সেই বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়। ক্লোভিস ২০১৫ সালে কিডনির ক্যানসারে মারা যান। এরপর থেকে তাঁর ছেলেকে প্রতিটি বিশ্বকাপে একই জার্সিতে, ট্রফি নিয়ে একই ভঙ্গিতে গ্যালারিতে দেখা যায়। বিশ্বকাপই পারে ভালোবাসার এমন গল্প বলতে।
বিশ্বকাপের চৌম্বকীয় টান
ইংল্যান্ডের উলভারহ্যাম্পটন সমর্থকদের এক দল ১৯৮৬ বিশ্বকাপ দেখতে মেক্সিকো গিয়ে আর ফিরতে চাননি; সেখানেই জীবন গড়ে নেন। আর্জেন্টিনার তিন যুবক ভিসেন্তে কনকুলিনি, মিগুয়েল সিলিও ও ইয়ামান্দু মার্তিনেজ সাইকেলে ১৭ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কানসাস সিটিতে পৌঁছান ১৬ জুন আলজেরিয়ার বিপক্ষে দেশের খেলা দেখতে। বিশ্বকাপের টান কতটা শক্তিশালী, তা এখান থেকেই বোঝা যায়।
বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক মুহূর্ত
১৯৩০ সালে বিশ্বকাপের জন্মের পর থেকে নানা অবিশ্বাস্য ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। প্রথম বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-উরুগুয়ের নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বল নিয়ে খেলা, মারাকানা ট্র্যাজেডি, মিরাকল অব বার্ন, হ্যান্ড অব গড—এসবই বিশ্বকাপের অমর অধ্যায়। বিশ্বকাপ মানুষকে শেখায়, অসম্ভব বলে কিছু নেই। মেসি, নেইমার, পেলে, ম্যারাডোনার মতো খেলোয়াড়রা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে থাকেন, যেখানে অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তিও মুছে যান।
এবারের বিশ্বকাপের বিশেষত্ব
২০২৬ বিশ্বকাপ ৪৮ দল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত হবে—এত বড় কলেবরের বিশ্বকাপ আগে কখনো হয়নি। তবে এটি সম্ভবত মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও নেইমারের শেষ বিশ্বকাপ। এই ত্রয়ী দুই যুগ ধরে বিশ্ব ফুটবলের প্রিয় মুখ। তাঁদের শেষ মুহূর্তগুলো মিস না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, কিলিয়ান এমবাপ্পে সর্বশেষ বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও মেসির আর্জেন্টিনার ট্রফি জয় ঠেকাতে পারেননি। এবার তিনি আরও আটঘাট বেঁধে নামবেন বলে ধারণা।
কিশোর প্রতিনিধি লামিনে ইয়ামাল
১৮ বছর বয়সী লামিনে ইয়ামাল স্পেনের আশা-ভরসার প্রতীক। তাঁর বয়সী ছেলেমেয়েদের জন্য তিনি প্রেরণা। বিশ্বকাপে গোটা পৃথিবীর কিশোরদের পথ দেখাচ্ছেন তিনি। ১৭ বছর ২৪৯ দিন বয়সে পেলে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন; লামিনেও সেই পথে হাঁটতে চান।
হারেও জন্ম নেয় প্রেরণা
১৯৫০ বিশ্বকাপে মারাকানায় ব্রাজিলের হারের পর কষ্টে কেউ কেউ স্টেডিয়ামের ছাদ থেকে লাফ দিয়েছিলেন। সেই শোককে শক্তি বানিয়ে ব্রাজিল পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে। মেসি ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর আর্জেন্টাইনদের আস্থা হারিয়েছিলেন, কিন্তু সর্বশেষ বিশ্বকাপ জিতে ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেখিয়েছেন, অসম্ভব বলে কিছু নেই।
বিশ্বমিলনের উৎসব
২০২২ বিশ্বকাপ দেখেছে ৫০০ কোটি মানুষ। এবার দল বাড়ায় দর্শক আরও বাড়বে। গ্রামে, পাড়া-মহল্লায় বাড়বে পতাকার বৈচিত্র্য। বিশ্বকাপের মৌসুম আমের মৌসুমের মতো সমাগত। মেসির ভাষায়, 'যেকোনো কিছুই হতে পারে!' বিশ্বকাপের প্রতি পদে পদে রোমাঞ্চ। এখনো কোনো দল পছন্দ না হলে একটি বেছে নিন; শুরু হোক থ্রিলার রাইড।



