বিশ্বকাপ শুরুর আগে এক সাক্ষাৎকারে সাদা জার্সি পরে বসেছিলেন তিনি, বুকে লেখা ‘কাবু ভের্দি’। তখনো কেউ চেনে না তাকে। লাজুক হেসে বলেছিলেন, লিওনেল মেসির বিপক্ষে খেলার স্বপ্ন দেখেন। কে জানত, ভোজিনিয়ার স্বপ্নটা এভাবে সত্যি হয়ে যাবে! সত্যিই তিনি বিশ্বকাপে মেসির বিপক্ষে খেলবেন, অন্তত একটা দিনের জন্য মেসির সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষও হয়ে যাবেন! বাংলাদেশ সময় আজ ভোর ৪টায় শেষ ৩২-এর ম্যাচে মেসির আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ভোনিজিয়ার কেপ-ভার্দে।
অচেনা গোলরক্ষক থেকে বিশ্বকাপের তারকা
একেবারে অচেনা এক গোলরক্ষক হয়ে বিশ্বকাপে এসেছিলেন। তার দল কেপ ভার্দে বিশ্বকাপে খেলছেই এই প্রথম, সুতরাং তাকে চেনার কোনো কারণই ছিল না। কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে সাতটা সেভ করে ম্যাচ গোলশূন্য রাখার ম্যাচে ভোজিনিয়া বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ইতিহাস মাঝেমধ্যে সবচেয়ে অচেনা মুখেই বাসা বাঁধে।
উরুগুয়ের বিপক্ষে ১-০ এগিয়ে গিয়েও ২-১ পিছিয়ে পড়া, তারপর আবার ২-২ করে ফেরা—এই এক ম্যাচেই যেন গোটা কেপ-ভার্দের গল্পটা ধরা আছে। পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়ানো। সৌদি আরবের বিপক্ষে আরেকটা ক্লিন শিট। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠা সবচেয়ে ছোট দেশ এখন তারা। ভোজিনিয়া নিজেই বলেছেন, ‘আমরা ছোট, কিন্তু আমাদের হৃদয়টা বড়। আমরা লড়াকু।’
ইনস্টাগ্রামে ফ্যান ফোলোয়িং ৪৫ হাজার থেকে ১৭ লাখ
তত দিনে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চমক হয়ে গেছে কেপ ভার্দে, ভোজিনিয়া হয়ে গেছেন ছোট দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় তারকা। স্পেনের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটার আগে ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারী ছিল মাত্র ৪৫ হাজার, এখন সাড়ে ১৭ লাখ! এবার প্রতিপক্ষ লিওনেল মেসি। যার ইনস্টাগ্রাম অনুসারী ৫১ কোটির বেশি! কিন্তু ভোজিনিয়ার আসল লড়াই সংখ্যার সঙ্গে নয়, কিংবদন্তির সঙ্গে।
মেসির রেকর্ড ও পরিসংখ্যান
এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ৬ গোল মেসির, মাত্র ৩টা ম্যাচে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনটাও তার দখলে। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডও তার, কেপ ভার্দের বিপক্ষে বিশ্বকাপে নিজের ৩০তম ম্যাচ খেলবেন কয়েক দিন আগে ৩৯তম জন্মদিন উদ্যাপন করা আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
অথচ অপ্টার পরিসংখ্যান বলছে, গ্রুপ পর্বে সবচেয়ে কম দৌড়ানো খেলোয়াড়দের একজন তিনি। গ্রুপ পর্বে অন্তত ৯০ মিনিট খেলেছেন এমন খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে ‘অলস’ তিনি, প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে মাত্র ৮.১ কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছেন। তাতে কী, বল তো ঠিকই তার হয়ে দৌড়াচ্ছে। তিনি ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় থাকেন, অথবা অন্যরা যাতে ঠিক জায়গায় থাকেন, সেটা নিশ্চিত করেন। জাদুর জন্য পায়ের গতির চেয়ে বেশি দরকার মাথার হিসাব।
কোচ ও প্রেসিডেন্টের বক্তব্য
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছেন, ‘কেপ-ভার্দে যে কঠিন প্রতিপক্ষ নয়, এমন দাবি করাটা মিথ্যাচার হবে।’ কেপ-ভার্দের প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া নেভেস আবার চেয়েছেন, মেসিকে যেন সম্মান জানিয়ে জাতীয় দলের জার্সি উপহার দেওয়া হয়, আর তারপরই আশা প্রকাশ করেছেন, তার দেশ ১-০ গোলে হারাবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের।
ভোজিনিয়ার নির্দিষ্ট স্বপ্ন
ভোজিনিয়ার স্বপ্নটা আরও নির্দিষ্ট। কেপ ভার্দে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে, খেলার শেষ দিকে পেনাল্টি পেয়েছেন মেসি নিজে। তিনি সেটা ঠেকিয়ে দিলেন। এই দৃশ্যটাই বিশ্বকাপ শুরুর আগে কল্পনা করেছিলেন ভোজিনিয়া। ‘সেটা যদি সেভ করতে পারি, সত্যিকারের স্বপ্নপূরণ হবে’— বলেছিলেন তিনি।
বাংলাদেশ সময় আজ ভোরে মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে দুটো পৃথিবী। একদিকে ফুটবলের সবচেয়ে বড় নাম, যাকে নিয়ে নতুন করে বলার কিছু বাকি নেই। অন্যদিকে একটা দ্বীপরাষ্ট্র, জনসংখ্যায় যেটা ঢাকার অনেক নির্বাচনী আসনের চেয়েও ছোট। কিন্তু ফুটবলে ছোট-বড়র হিসাব সব সময় মাঠের বাইরের গল্প। মাঠের ভেতরে গোলপোস্টের উচ্চতা সবার জন্য সমান।
মেসি হয়তো আরও একটা রেকর্ড গড়বেন। কিংবা ভোজিনিয়ার হাত ছুঁয়ে ফিরে যাবে তার নেওয়া কোনো শট, আর এক দ্বীপরাষ্ট্র উৎসবে ভাসবে যেভাবে তারা কোনো দিন ভাসেনি। যা-ই ঘটুক, ফলাফলের বাইরে একটা সত্যি থেকে যাবে। বিশ্বকাপ প্রতিবারই এমন একজনকে খুঁজে বের করে আনে, যার নাম আগে কেউ জানত না, অথচ তাকে ছাড়া বিশ্বকাপের গল্পটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এবার সেই নামটা ভোজিনিয়া। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই মানুষ, যাকে টিভির পর্দায় দেখে তিনি নিজেও একদিন স্বপ্ন দেখেছিলেন মুখোমুখি হওয়ার। স্বপ্ন দেখছেন তার একটা পেনাল্টি শট ঠেকিয়ে দেওয়ার। আজ ভোরে ভোজিনিয়া শুধু গোলই রক্ষা করবেন না, তিনি রক্ষা করবেন একটা দ্বীপের বিশ্বাস।



