হাইতির বিপক্ষে স্কটল্যান্ডের জয় তাদের ২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল করেছে। যদি তারা শেষ পর্যন্ত গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারে, তবে সেটি হবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্কটল্যান্ডের নকআউট পর্বে যাওয়া।
তবে এটিকে সরাসরি স্কটল্যান্ডের সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ সাফল্য বলা কিছুটা বিভ্রান্তিকর হবে। কারণ এটি প্রথম ৪৮ দলের বিশ্বকাপ। এর আগে স্কটল্যান্ড ১৬ দলের বিশ্বকাপেও অংশ নিয়েছিল। ফলে প্রযুক্তিগতভাবে বলতে গেলে, শুধু শেষ ৩২ বা শেষ ১৬-তে ওঠা তাদের অতীতের সেরা অর্জনের সমতুল্য নয়; বরং রাউন্ড অব ১৬ অতিক্রম করলেই তারা সত্যিকারের নতুন ইতিহাস গড়বে।
একই ধরনের পরিস্থিতি বিশ্বের আরও অনেক দলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮টি দলের মধ্যে প্রত্যেকের অতীতের সেরা বিশ্বকাপ অর্জন এবং এবার সেটিকে ছাড়িয়ে যেতে কী করতে হবে, তা দেওয়া হলো-
বিশ্বকাপজয়ী দলগুলো
ব্রাজিল, জার্মানি, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, উরুগুয়ে, ইংল্যান্ড ও স্পেন—এ সাতটি দল ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছে। ইতালি, যারা অতীতে বিশ্বকাপ জিতেছে, এবার টুর্নামেন্টে নেই।
তবুও এসব দলের সামনে নতুন ইতিহাস গড়ার সুযোগ রয়েছে। ইংল্যান্ড কখনও নিজেদের দেশের বাইরে বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। উরুগুয়ে ও ফ্রান্সও নিজেদের মহাদেশের বাইরে শিরোপা জয়ের অপেক্ষায়। আর্জেন্টিনা তিনবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলেও কখনও টানা দুইবার শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি। সেটি করতে পারলে তারা নতুন মাইলফলক ছুঁবে।
রানার্স-আপ হওয়া দল
ক্রোয়েশিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেন অতীতে বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেছে। চেক প্রজাতন্ত্রের সাফল্য এসেছে চেকোস্লোভাকিয়ার সময়ে, আর নেদারল্যান্ডস তিনবার রানার্স-আপ হয়েছে।
তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দল
অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, পর্তুগাল ও তুরস্ক সেমিফাইনালে হেরে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ জিতে টুর্নামেন্ট শেষ করেছিল।
তৃতীয় বা যৌথ তৃতীয়
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাফল্য ছিল তৃতীয় বা যৌথ তৃতীয় স্থানে থাকা।
চতুর্থ স্থান
দক্ষিণ কোরিয়া (২০০২) এবং মরক্কো (২০২২) বিশ্বকাপে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছে। এশিয়া ও আফ্রিকার কোনো দেশের জন্য এটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ অবস্থান।
কোয়ার্টার-ফাইনাল
কলম্বিয়া, ঘানা, মেক্সিকো, প্যারাগুয়ে, সেনেগাল ও সুইজারল্যান্ডের সেরা সাফল্য কোয়ার্টার-ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছানো।
মেক্সিকো এর আগে নিজেদের আয়োজিত দুই বিশ্বকাপ—১৯৭০ ও ১৯৮৬—উভয়বারই শেষ আটে উঠেছিল। বাকি দলগুলোর অধিকাংশ সাফল্য এসেছে একবিংশ শতাব্দীতে।
এ পর্যন্ত হিসাবটি তুলনামূলক সহজ। কারণ ১৯৫০ বিশ্বকাপ বাদে প্রতিটি আসরেই কোয়ার্টার-ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনাল ছিল। কিন্তু এরপরের পর্যায়গুলো তুলনা করা কিছুটা জটিল।
শেষ ১৬ পর্যন্ত পৌঁছানো দল
আলজেরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কঙ্গো, ইকুয়েডর, মিশর, হাইতি, ইরান, জাপান, নরওয়ে, সৌদি আরব, স্কটল্যান্ড ও তিউনিসিয়ার সর্বোচ্চ সাফল্য ছিল ১৬ দলের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া বা শেষ ১৬-এর সমতুল্য অবস্থানে পৌঁছানো।
আলজেরিয়া ১৯৮২ সালে পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার বিতর্কিত সমঝোতার কারণে নকআউটে উঠতে পারেনি। তবে ২০১৪ সালে তারা শেষ ১৬-এ পৌঁছে পরবর্তীতে চ্যাম্পিয়ন জার্মানির কাছে হেরেছিল। সেই সাফল্য ছাড়িয়ে যেতে হলে এবার তাদের গ্রুপ পর্ব ও প্রথম নকআউট ম্যাচ দুটিই জিততে হবে।
অস্ট্রেলিয়া দুইবার ৩২ দলের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে নকআউটে উঠেছিল, কিন্তু প্রথম নকআউট ম্যাচেই বিদায় নিয়েছে।
মিশরের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও ভিন্ন। তারা ১৯৩৪ সালে ১৬ দলের বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল। তবে সেখানে পৌঁছাতে মাত্র একটি দলকে হারাতে হয়েছিল এবং মূল পর্বে একমাত্র ম্যাচেই হাঙ্গেরির কাছে হেরে বিদায় নেয়।
স্কটল্যান্ড বিশ্বকাপ খেলেছে ১৬, ২৪, ৩২ এবং এখন ৪৮ দলের আসরে। ১৯৭৪ সালে ব্রাজিল ও যুগোস্লাভিয়ার সঙ্গে একই গ্রুপে থেকে চার পয়েন্ট অর্জন করেও গোল ব্যবধানে বাদ পড়েছিল। সেই গ্রুপের আরেক দল ছিল জায়ার, যা বর্তমানে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো নামে পরিচিত।
হাইতিও ১৯৭৪ বিশ্বকাপে খেলেছিল। ইতালি, পোল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার কাছে হেরে তারা বিদায় নেয়। এবার তাদের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ই হবে বিশাল অর্জন।
তিউনিসিয়া ছয়বার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। তারা এখনও কখনও নকআউটে উঠতে পারেনি। তবে ১৯৭৮ সালে ১৬ দলের বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল, যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; কারণ তখন আফ্রিকার জন্য মাত্র একটি আসন বরাদ্দ ছিল।
‘শেষ ২৪’-এর সমতুল্য অর্জন
নিউজিল্যান্ড, কানাডা ও ইরাকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ব্যতিক্রম।
নিউজিল্যান্ড ১৯৮২ সালে ২৪ দলের বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল। অস্ট্রেলিয়াকে পিছনে ফেলে এবং পরে সৌদি আরবকে প্লে-অফে হারিয়ে তারা মূল পর্বে পৌঁছায়। বর্তমানে ‘শেষ ২৪’ বলে কোনো ধাপ নেই। তাই তাদের অতীতের সাফল্য ছাড়িয়ে যেতে হলে অন্তত শেষ ১৬-তে উঠতে হবে।
কানাডাও একই অবস্থায় রয়েছে। ১৯৮৬ ও ২০২২ সালে তারা বিশ্বকাপের ছয়টি ম্যাচই হেরেছিল। ফলে ২০২৬ সালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ড্র করাও বড় অর্জন। তবে ১৯৮৬ সালে ২৪ দলের বিশ্বকাপে কনকাকাফ অঞ্চলের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করাই এখনো তাদের বড় সাফল্য।
ইরাকও ১৯৮৬ বিশ্বকাপে খেলেছিল এবং তিনটি ম্যাচই এক গোলের ব্যবধানে হেরেছিল।
শেষ ৩২ পর্যন্ত পৌঁছানো দল
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, আইভরি কোস্ট, পানামা, কাতার ও দক্ষিণ আফ্রিকার সেরা অর্জন হলো ৩২ দলের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ। তবে কাতার এবারের বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডকে রুখে দিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ পয়েন্ট অর্জন করেছে।
এদের জন্য এবার নকআউট পর্বে ওঠা অতীতের সেরা সাফল্যের সমতুল্য হবে, কিন্তু তা ছাড়িয়ে যাওয়া নয়।
আইভরি কোস্ট এখানে সবচেয়ে বিস্ময়কর নাম। ২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪ সালে তাদের স্বর্ণালী প্রজন্ম থাকা সত্ত্বেও কঠিন ড্রয়ের কারণে তারা বড় সাফল্য পায়নি। এবার ৪৮ দলের বিশ্বকাপের সুবিধায় তারা গ্রুপে কুরাসাওয়ের মতো তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হচ্ছে।
কাতারের একমাত্র পূর্ববর্তী বিশ্বকাপ ছিল ২০২২ সালে, স্বাগতিক দেশ হিসেবে। এবারই প্রথম তারা যোগ্যতা অর্জন করে বিশ্বকাপে এসেছে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ১-১ ড্র করে তারা প্রথম বিশ্বকাপ পয়েন্টও অর্জন করেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপের অভিষিক্ত দল
কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান ও উজবেকিস্তান প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলছে।
৪৮ দলে বাড়ানোর পরও মাত্র চারটি নতুন দল দেখা যাচ্ছে, যা কিছুটা বিস্ময়কর।
তবে বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নেওয়া মানেই এই নয় যে তারা আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে উজবেকিস্তানকে ধরা যায়। ২০১৮ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তারা এশিয়ার তৃতীয় রাউন্ডে নিজেদের গ্রুপে চতুর্থ হয়েছিল, অর্থাৎ মহাদেশের সেরা আট দলের মধ্যে ছিল। যদি তখনই ৪৮ দলের বিশ্বকাপ চালু থাকত, তাহলে তারা রাশিয়া বিশ্বকাপেই খেলতে পারত।
উজবেকিস্তান এমন একটি দলের উদাহরণ, যারা হঠাৎ করে অনেক উন্নতি করেনি; বরং বিশ্বকাপের দল বাড়ানোর ফলে এবার সুযোগ পেয়েছে।
২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু নতুন চ্যাম্পিয়ন খোঁজার লড়াই নয়, বরং বিভিন্ন দেশের জন্য নিজেদের ইতিহাস নতুন করে লেখার সুযোগও। তবে ৪৮ দলের নতুন কাঠামো পুরোনো অর্জনের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করাকে কঠিন করে তুলেছে। তাই কোনো দল নকআউটে উঠলেই যে সেটি তাদের সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ সাফল্য হবে, এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত ইতিহাস গড়তে তাদের আরও এক বা একাধিক ধাপ এগোতে হবে।



