ভিএআর প্রযুক্তি: ২০২৬ বিশ্বকাপে বিতর্ক ও কাজের পদ্ধতি
ভিএআর প্রযুক্তি: ২০২৬ বিশ্বকাপে বিতর্ক ও কাজের পদ্ধতি

ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) প্রযুক্তি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপজুড়ে নানা আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ৭ জুলাই মিশর ও আর্জেন্টিনার শেষ ষোলোর ম্যাচের পর বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। ম্যাচের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ভিএআরের নিরপেক্ষতা ও প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচে কী ঘটেছিল?

ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল মিশর। কিন্তু শেষ দিকে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা টানা তিন গোল করে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয়। এর মাঝেই মিশরের একটি গোল বাতিল হয় এবং শেষ মুহূর্তে তাদের পেনাল্টির আবেদন নাকচ হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে দলটি।

ম্যাচ শেষে মিশরের কোচ হোসাম হাসান বলেন, "হয়ত তারা (ফিফা) বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের টুর্নামেন্টে রাখতে চেয়েছিল। হয়ত তারা চেয়েছিল মেসি লড়াইয়ে টিকে থাকুক।"

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মিশরের সবচেয়ে বড় আপত্তি ছিল দ্বিতীয়ার্ধে মোস্তাফা জিকোর গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে। ভিএআর পর্যালোচনায় দেখা যায়, আক্রমণ শুরুর আগে মিডফিল্ডার মারওয়ান আতিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ের ওপর পা রেখেছিলেন। সেই কারণেই গোলটি বাতিল করা হয়।

অন্যদিকে মিশরের দাবি, কিছুক্ষণ পর আর্জেন্টিনার পেনাল্টি বক্সে মোহামেদ সালাহও একই ধরনের ফাউলের শিকার হলেও রেফারি কিংবা ভিএআর কেউই হস্তক্ষেপ করেননি। এরপরই পালটা আক্রমণে গিয়ে জয়সূচক গোল করে আর্জেন্টিনা। ফলে দুটি ঘটনাতেই ভিএআরের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

ভিএআর কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?

ফুটবলে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) প্রযুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৮ সালে ফিফা চালু করে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ভাষায়, এর উদ্দেশ্য হলো রেফারিদের আরও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভিএআরের মূল কাজ হলো, মাঠের রেফারি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা দেখতে না পেলে বা স্পষ্ট ভুল সিদ্ধান্ত দিলে ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাকে সহায়তা করা। মাঠের বাইরে থাকা বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তারা বিভিন্ন ক্যামেরার ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজন হলে মাঠের রেফারিকে সাইডলাইন মনিটরে গিয়ে ঘটনা পুনরায় দেখতে বলেন। সবশেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব থাকে মাঠের রেফারির ওপর।

ফিফার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৩০০টিরও বেশি প্রতিযোগিতায় বর্তমানে ভিএআর ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে ভিএআরের অপারেশন কক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে স্থাপন করা হয়েছে।

সব ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রেই কি এটি ব্যবহার করা যায়?

শুরুতে ভিএআর কেবল চার ধরনের ঘটনায় ব্যবহার করা হতো—গোল, পেনাল্টি, সরাসরি লাল কার্ড এবং ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে আরও দুটি বিষয় যুক্ত হয়েছে। এখন স্পষ্টভাবে ভুল কর্নার কিকের সিদ্ধান্ত এবং দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের মাধ্যমে লাল কার্ড প্রদর্শনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভুল হলেও ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারে।

তবে বল গোললাইন অতিক্রম করেছে কি না, তা নির্ধারণে ভিএআরের ভূমিকা নেই। এ জন্য আলাদা গোললাইন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যেখানে ম্যাচ বলের ভেতরে থাকা বিশেষ চিপ সরাসরি রেফারির স্মার্টওয়াচে সংকেত পাঠায়।

কতদিন ধরে ব্যবহার হচ্ছে এবং এটি কি সিদ্ধান্ত বদলে দেয়?

২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ভিএআর ব্যবহার করা হয়। সেই আসরে ৬৪ ম্যাচে ২০ বার হস্তক্ষেপ করে প্রযুক্তিটি এবং এর মধ্যে ১৭টি ক্ষেত্রে রেফারির মূল সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়।

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত ছিল ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার ফাইনাল। ভিএআর পর্যালোচনার পর রেফারি হ্যান্ডবলের সিদ্ধান্ত বদলে ফ্রান্সকে পেনাল্টি দেন। সেই গোলেই ম্যাচে এগিয়ে যায় ফরাসিরা এবং শেষ পর্যন্ত ৪-২ ব্যবধানে শিরোপা জেতে।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ভিএআর ২৭ বার হস্তক্ষেপ করে। মাঠের পাশের মনিটরে পাঠানো অধিকাংশ ঘটনাতেই রেফারিরা নিজেদের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।

বর্তমান টুর্নামেন্টে কী ঘটছে?

২০২৬ বিশ্বকাপ এখনও চলমান, পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান তাই এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। তবে বিবিসি স্পোর্টের ভিএআর বিশ্লেষক ডেইল জনসনের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৯৬ ম্যাচে রেফারিদের ২৩ বার সাইডলাইন মনিটরে ডাকা হয়েছে। আগের দুই বিশ্বকাপের তুলনায় ম্যাচপ্রতি এই সংখ্যা কম। মাত্র একটি ঘটনায় ভিডিও পর্যালোচনার পরও রেফারি নিজের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন।

জনসনের মতে, সম্প্রতি ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়ারলুইজি কলিনা রেফারিদের নির্দেশ দিয়েছেন স্বাভাবিক শারীরিক সংস্পর্শকে খেলার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে, যাতে খেলার গতি বজায় থাকে। এর প্রভাবও পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে। এবারের বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে গড়ে ২২.৬টি ফাউল হয়েছে, যেখানে ২০২২ সালে ছিল ২৫ এবং ২০১৮ সালে ছিল ২৭টি।

তবে মিশরের গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনসন। তার মতে, টুর্নামেন্টজুড়ে যে মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত তার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, "আপনি যদি মাঠে এ ধরনের চ্যালেঞ্জ চলতে দেন, তাহলে ভিএআরের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে।"

তার মতে, বর্তমান বিশ্বকাপে ভিএআরের সিদ্ধান্তগুলো আগের চেয়ে আরও অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হচ্ছে, ফলে কোন পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিটি হস্তক্ষেপ করবে, তা আগাম অনুমান করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে মোহামেদ সালাহর সম্ভাব্য পেনাল্টির ঘটনায় তিনি তেমন বিতর্ক দেখছেন না। জনসনের ব্যাখ্যা, সালাহ পেনাল্টি বক্সের ভেতরে ছিলেন। তাই ভিএআর সম্ভাব্য পেনাল্টি যাচাই করছিল, যেখানে ফাউল প্রমাণের মানদণ্ড আরও কঠোর।

তথ্যসূত্র: বিবিসি স্পোর্ট