নোবেলজয়ী পদার্থবিদ স্টিভেন ওয়াইনবার্গ ১৯৬৭ সালে একটি লাল শেভ্রোলে কামারো গাড়িতে বসে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারটি করেছিলেন। তিনি পরমাণুর নিউক্লিয়াসের শক্তিশালী বল বোঝার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু তাঁর হিসাব–নিকাশ বারবার শূন্য ভরের একটি কণার অস্তিত্ব ইঙ্গিত করছিল। হঠাৎ তাঁর মাথায় খেলে যায় যে ওই ভরহীন কণাটি আসলে ফোটন ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি ছিল বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় ও দুর্বল নিউক্লীয় বলের একীভূত তত্ত্বের সূচনা, যা পরে স্ট্যান্ডার্ড মডেল নামে পরিচিত হয়।
স্ট্যান্ডার্ড মডেলের জন্ম
ওয়াইনবার্গ বলেন, “আমি পরমাণুর নিউক্লিয়াসের শক্তিশালী বলের ব্যাখ্যা দেয়, এমন একটি তত্ত্ব খুঁজছিলাম। কিন্তু এর বদলে এমন একটি তত্ত্ব পেয়ে গেলাম, যা আলো ও দুর্বল নিউক্লীয় বলকেই ব্যাখ্যা করে।” তাঁর এই উপলব্ধি মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানকে একটি নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছিল। তবে তাঁর ধারণার সঠিকতা প্রমাণিত হতে ছয় বছর লেগেছিল।
একীভূত করার আকাঙ্ক্ষা
ওয়াইনবার্গের মতে, প্রকৃতিকে সহজভাবে বোঝার জন্য একীভূত করা জরুরি। তিনি নিউটনের উদাহরণ দেন, যিনি দেখিয়েছিলেন যে মাটিতে পড়ন্ত পাথর ও গ্রহগুলো একই মহাকর্ষীয় নিয়ম মেনে চলে। তবে এই একত্রীকরণের জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়—মৌলিক নিয়মগুলো সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে চলে যায়।
পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষা ও প্রচার
ওয়াইনবার্গ মনে করেন, তরুণদের কাছে পদার্থবিজ্ঞানকে সহজভাবে উপস্থাপন করা উচিত। তিনি বলেন, “বেশির ভাগ মানুষের জন্য গণিতের ভাষায় মুড়িয়ে উপস্থাপন করা শিক্ষা কার্যকর নয়। শিক্ষার্থীদের মহান পদার্থবিজ্ঞানীদের আবিষ্কার বুঝতে সাহায্য করার জন্য গল্প বলা উচিত।” তিনি নিজে বিংশ শতাব্দীর পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন, কিন্তু তা শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।
লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার ও হিগস বোসন
২০০৮ সালে সার্নে লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার (এলএইচসি) চালু করা হয়, যার শক্তিমাত্রা টেক্সাসে ওয়াইনবার্গের কাঙ্ক্ষিত যন্ত্রের মতোই ছিল। দুর্ঘটনার কারণে এলএইচসি এক বছরের বেশি সময় বন্ধ ছিল। ওয়াইনবার্গ বলেন, “আমরা এই যন্ত্রটির জন্য এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছি যে দুর্ঘটনার কারণে এই বিলম্ব খুব বড় কোনো বিষয় নয়।” তিনি আশা করছেন যে এলএইচসি হিগস বোসন এবং ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে নতুন তথ্য দেবে।
ডার্ক ম্যাটার ও সুপারসিমেট্রি
ওয়াইনবার্গ বলেন, “এখন পর্যন্ত ডার্ক ম্যাটার কী দিয়ে গঠিত, সে সম্পর্কে আমাদের বিন্দুমাত্র ধারণাও নেই। পরিচিত মৌলিক কণাগুলোর জগতে সুপারসিমেট্রি নামের একটি কাঠামোর প্রমাণ খুঁজে পাওয়াটাও দারুণ ব্যাপার হবে।” তিনি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে এই বিষয়ে কাজ করছেন।
সৌন্দর্য ও তত্ত্ব
ওয়াইনবার্গ সৌন্দর্যকে তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করেন। তিনি বলেন, “এমন একটি তত্ত্ব, যেখানে সংযোগগুলো অবধারিতভাবেই উঠে আসে, সবকিছু একে অপরের সঙ্গে মিলে যায়, আর আপনি যদি এর ছোট্ট একটি অংশও পরিবর্তন করার চেষ্টা করেন, তাহলে পুরো ইমারতই ভেঙে পড়বে।” তিনি কোয়ান্টাম মেকানিকসের উদাহরণ দেন, যা এই মানদণ্ড পূরণ করে, কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড মডেল তা করে না।
চূড়ান্ত তত্ত্বের সন্ধান
ওয়াইনবার্গ ‘থিওরি অব এভরিথিং’ শব্দটি পছন্দ করেন না। তিনি বলেন, “এর মানে দাঁড়ায় যে ওই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারলে আমরা বোধ হয় সবকিছুই বুঝে ফেলব। কিন্তু বাস্তবে তা হবে না।” তিনি একে ‘ফাইনাল থিওরি’ বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
মহাবিশ্বের অর্থহীনতা
ওয়াইনবার্গের বিখ্যাত বই ‘দ্য ফার্স্ট থ্রি মিনিটস’ শেষ হয়েছে এই বাক্যে: “মহাবিশ্বকে যত বেশি বোধগম্য বলে মনে হয়, একে ততটাই উদ্দেশ্যহীন বলেও মনে হয়।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, “প্রকৃতির নিয়মের মধ্যে এমন কিছুর ইঙ্গিত নেই, যা প্রমাণ করে যে এই মহাবিশ্বে আমাদের কোনো বিশেষ জায়গা রয়েছে। তবে এর মানে এই নয় যে আমি আমার জীবনকে অর্থহীন মনে করি। আমরা একে অপরকে ভালোবাসতে পারি এবং এই জগৎটাকে বোঝার চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু আমাদের জীবনের এই অর্থটুকু আমাদের নিজেদেরই তৈরি করে নিতে হবে।”



