বিশ্বকাপের দ্বিতীয় কোয়ার্টার-ফাইনালে শনিবার দিবাগত রাত ১টায় লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন এবং বেলজিয়াম। জয়ী দল পৌঁছে যাবে সেমিফাইনালে, আর পরাজিত দল বিদায় নেবে অপূর্ণতা নিয়ে।
চার দশকের পুরনো স্মৃতি
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে স্পেন ও বেলজিয়ামের মধ্যে এক রোমাঞ্চকর ম্যাচ হয়েছিল। অতিরিক্ত সময় শেষে ১-১ সমতায় থাকা ম্যাচটি টাইব্রেকারে ৫-৪ ব্যবধানে জিতে শেষ চারে উঠেছিল বেলজিয়াম। প্রায় চল্লিশ বছর পর আবার বিশ্বকাপের শেষ আটে দেখা। এবার প্রতিশোধ নেবে স্পেন, নাকি ইতিহাস আবারও বেলজিয়ামের পক্ষে হাসবে?
পরিসংখ্যান ও বর্তমান ফর্ম
দুই দলের ২৩টি মুখোমুখি লড়াইয়ে স্পেনের জয় ১২টি, বেলজিয়ামের মাত্র ৫টি; ছয়টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। তবে নকআউট পর্বে পরিসংখ্যান খুব কমই শেষ কথা বলে। একটি ভুল বা একটি জাদুকরী মুহূর্ত বদলে দিতে পারে পুরো ইতিহাস।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন এই বিশ্বকাপে শিল্প আর শৃঙ্খলার অপূর্ব সংমিশ্রণ। বল দখল, দ্রুত পাস, নিখুঁত প্রেসিং এবং ধৈর্যের সঙ্গে প্রতিপক্ষকে ভেঙে ফেলার দর্শন আবারও দেখা যাচ্ছে। পর্তুগালের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে কোয়ার্টার-ফাইনালে ওঠা স্পেন শিরোপার অন্যতম দাবিদার।
বেলজিয়ামকে অবমূল্যায়নের সুযোগ নেই। রাউন্ড অব ৩২-এ সেনেগালের বিপক্ষে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগেও তারা ০-২ গোলে পিছিয়ে ছিল, কিন্তু অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে ৩-২ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয়। শেষ ষোলোতে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত করে তারা।
থিবো কর্তোয়ার বক্তব্য
বেলজিয়ামের গোলকিপার থিবো কর্তোয়া, যিনি আতলেতিকো মাদ্রিদ ও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে দীর্ঘ সময় খেলে স্পেনকে খুব কাছ থেকে চেনেন, বলেন, ‘স্পেন অবশ্যই ফেভারিট। বল দখল, দ্রুত প্রেসিং এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে তারা অসাধারণ। আমাদের দলেও এমন অনেক ফুটবলার আছে যারা এক মুহূর্তেই ম্যাচের রং বদলে দিতে পারে। তাদের রক্ষণে যে ছোট ছোট ফাঁকা জায়গা তৈরি হবে, সেটাই কাজে লাগাতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বকাপে অঘটন প্রতি আসরেই ঘটে। এবারও নতুন ইতিহাস লেখা সম্ভব। ইউরো চ্যাম্পিয়নদের বিদায় করাতে পারলে সেটি হবে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চমকগুলোর একটি।’
মূল খেলোয়াড় ও কৌশল
স্পেনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ লামিন ইয়ামাল। কিশোর বয়সেই তিনি ভবিষ্যতের ফুটবলের প্রতীক। মাঝমাঠে পেদ্রির নিখুঁত পাসিং, রদ্রির নেতৃত্ব, মিকেল মেরিনোর অক্লান্ত পরিশ্রম এবং মিকেল ওয়ারসাবালের সৃজনশীলতা স্পেনকে দিয়েছে অনন্য ভারসাম্য।
অন্যদিকে বেলজিয়ামের কেভিন ডি ব্রুইনার অভিজ্ঞতা, জেরেমি ডকুর বিস্ফোরক গতি, রোমেলু লুকাকুর শক্তিমত্তা এবং থিবো কর্তোয়ার অদম্য নৈপুণ্য রয়েছে। ডি ব্রুইনার জন্য এটি হয়ত শেষ বিশ্বকাপ, আর ইয়ামালের জন্য এটি বিশ্ব ফুটবলের নতুন রাজপুত্র হয়ে ওঠার সুযোগ।
কৌশলগতভাবে ম্যাচটি হবে ভিন্ন দুই দর্শনের সংঘর্ষ। স্পেন চাইবে বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তুলতে, ধৈর্যের সঙ্গে আক্রমণ গড়ে তুলতে। বেলজিয়াম অপেক্ষা করবে একটি ভুলের জন্য, বল পেলেই বিদ্যুৎগতির পালটা আক্রমণে স্পেনের রক্ষণ ভেঙে দিতে চাইবে।
মাঝমাঠের লড়াই
সম্ভবত মাঝমাঠের লড়াইটিই নির্ধারণ করবে ম্যাচের ভাগ্য। রদ্রি ও পেদ্রি যদি ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে স্পেন এগিয়ে থাকবে। আর যদি ডি ব্রুইনা ও ডকু দ্রুত ট্রানজিশনে সফল হন, তাহলে বেলজিয়ামও ইতিহাস গড়তে পারে।
নকআউট ম্যাচে নায়ক আর খলনায়কের ব্যবধান মাত্র একটি মুহূর্ত। একটি গোললাইন ক্লিয়ারেন্স, একটি দুর্দান্ত সেভ, একটি নিখুঁত কর্নার কিংবা অসাধারণ ফিনিশই লিখে দেয় নতুন ইতিহাস।



