রিভালদো: দারিদ্র্যের শৈশব থেকে বিশ্বসেরার আসনে
রিভালদো: দারিদ্র্যের শৈশব থেকে বিশ্বসেরা

ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রেসিফের ফাভেলাস নামে পরিচিত এক অখ্যাত বস্তিতে ১৯৭২ সালে জন্মগ্রহণ করেন রিভালদো। বড় দুই ভাই এবং ছোট দুই বোনের সঙ্গে খাবার টেবিলে প্রায়ই অভাবে পড়তো তার পরিবার। পুষ্টিহীনতার কারণে তিনি তার সামনের দাঁত হারান এবং হাঁটুতে স্পষ্ট বাঁক দেখা যায়। ছোটবেলায় পরিবারের আয় বাড়াতে সপ্তাহান্তে তিনি বাগানের আগাছা পরিষ্কার করতেন। কখনও সমুদ্রসৈকতে চুইংগাম ও আইস ললি বিক্রি করতেন। সান্তা ক্রুজের ম্যাচের দিন স্টেডিয়ামের বাইরে বসেও বিক্রি করতেন বিভিন্ন পণ্য।

প্রথম বুট ও পিতার মৃত্যু

১৩ বছর বয়সে বাবা রোমিলদো তাকে প্রথম ফুটবল বুট কিনে দেন। ১৬ বছর বয়সে সান্তা ক্রুজের ট্রায়ালের ডাক পান তিনি। কিন্তু ট্রায়ালের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বাসের ধাক্কায় মারা যান তার বাবা। তবে কোন কিছুই তাকে শিখরে পৌঁছানো থেকে বিরত রাখতে পারেনি। ট্রায়ালে সফল হলেও সংগ্রাম থামেনি। সান্তা ক্রুজের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল বাড়ি থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে। অর্থাভাবে প্রতিদিন ৩০ কিলোমিটার পথ হেঁটে যাতায়াত করতে হতো তাকে। আর কিশোর বয়সে তার দৈহিক অবস্থার জন্যে কয়েকজন কোচও ফিরিয়ে দেন তাকে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বপ্নের শুরু

১৯৯১ সালের শুরুর দিক। ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শহর রেসিফের উপকণ্ঠে অবস্থিত দরিদ্র এলাকা পাউলিস্তার একটি বেকারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন ১৮ বছর বয়সি এক তরুণ। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম তার সাক্ষাৎকার নিতে এসেছে। দেখতে তিনি মোটেও একজন সম্ভাবনাময় ফুটবলারের মতো ছিলেন না। অপুষ্টিতে ভোগা শরীর, কাঁধ থেকে ঝুলে পড়া সাদামাটা বাদামি টি-শার্ট, ভিটামিন ডি-র ঘাটতিজনিত কারণে বাঁকা হয়ে যাওয়া পা, আর দীর্ঘদিনের অপুষ্টির ফলে কৈশোরেই হারিয়ে ফেলা অধিকাংশ দাঁত—সব মিলিয়ে জীবন যেন তাকে শুরু থেকেই কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছিল। কিছুদিন আগেই স্থানীয় ক্লাব সান্তা ক্রুজের হয়ে অভিষেক ম্যাচে দুর্দান্ত একটি হেড গোল করে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। সাক্ষাৎকারে যখন তার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলো, তিনি শান্তভাবে উত্তর দিয়েছিলেন—‘আমার স্বপ্ন তো ইতোমধ্যেই পূরণ হয়ে গেছে। সান্তা ক্রুজের হয়ে খেলতে পারছি। এখন শুধু চাই আরও ভালো করতে এবং ক্লাবের সমর্থকদের একজন প্রিয় খেলোয়াড় হতে।’ সেই তরুণের নাম ছিল রিভালদো।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উত্থান

পরবর্তী এক দশকে তিনি জয় করেন ব্যালন ডি’অর, নির্বাচিত হন ফিফা ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার, এবং বার্সেলোনার জার্সিতে এমন এক হ্যাটট্রিক করেন, যেটিকে অনেকেই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা হ্যাটট্রিক বলে মনে করেন। ২০০২ সালে ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ জয় করেন রোনালদো ও রোনালদিনিয়োর সঙ্গে গড়ে ওঠা কিংবদন্তি আক্রমণভাগের অন্যতম সদস্য হিসেবে। এরপর ২০০৩ সালে এসি মিলানের হয়ে জেতেন উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। কিন্তু তার গল্প শুধুই সাফল্যের নয়; এটি এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি শৈশবের দারিদ্র্যের কারণে বড় স্বপ্ন দেখার সাহসই পাননি।

মোগি মিরিম ও করিন্থিয়ান্স

মোগি মিরিমে গিয়ে রিভালদো নিজের প্রতিভার ঝলক দেখাতে শুরু করেন। এমনকি মাঝমাঠ থেকে গোল করে তিনি এমন এক কীর্তি গড়েন, যা কিংবদন্তি পেলের পক্ষেও সম্ভব হয়নি। ১৯৯৩ সালে করিন্থিয়ান্সে ধারে খেলতে গিয়ে ৫৮ ম্যাচে ২২ গোল করেন। মৌসুমসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন এবং মেক্সিকোর বিপক্ষে ব্রাজিলের হয়ে অভিষেক ম্যাচেই গোল করেন। এরপর পালমেইরাসে যোগ দিয়ে ১৯৯৪ সালে ব্রাজিলিয়ান লিগ জেতেন এবং আবারও বর্ষসেরা খেলোয়াড় হন। কিন্তু ব্রাজিল কোচ কার্লোস আলবার্তো পেরেইরা তাকে ‘অতিরিক্ত স্বার্থপর’ ও ‘অনির্ভরযোগ্য’ মনে করে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ দলে রাখেননি। বিশ্বকাপজয়ী সেই ব্রাজিল দলের অংশ হতে না পারা ছিল তার জন্য বড় আঘাত।

অলিম্পিকের হতাশা ও নতুন প্রেরণা

১৯৯৬ আটলান্টা অলিম্পিকে ব্রাজিলের হয়ে খেলেন রিভালদো। কিন্তু সেমিফাইনালে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও ব্রাজিল হেরে যায় ৪-৩ গোলে। সেই ম্যাচে একটি ভুল এবং একটি সহজ সুযোগ নষ্ট করার কারণে সমালোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন তিনি। ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। পরে রিভালদো বলেছিলেন, ওই সময়ের স্মৃতি তিক্ত। কিন্তু সেই সমালোচনাই আমাকে প্রমাণ করার প্রেরণা দিয়েছিল যে সমালোচনাগুলো অন্যায় ছিল।

বার্সেলোনায় বিশ্বজয়

১৯৯৭ থেকে ২০০২—এই সময়টিই ছিল রিভালদোর ক্যারিয়ারের স্বর্ণযুগ। বার্সেলোনার হয়ে তিনি ১৩০ গোল করেন। জেতেন দুটি লা লিগা শিরোপা ও একটি কোপা দেল রে। ১৯৯৯ সালে অর্জন করেন ব্যালন ডি’অর এবং ফিফা ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার পুরস্কার। তার খেলায় ছিল অসাধারণ গতি, শক্তি, বল নিয়ন্ত্রণ এবং সৃজনশীলতা। দূরপাল্লার গোল, নিখুঁত পাস, রাবোনা, ওভারহেড কিক—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন অনন্য।

ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক

২০০১ সালে মৌসুমের শেষ ম্যাচে বার্সেলোনার চ্যাম্পিয়ন্স লিগে জায়গা নিশ্চিত করতে জয় প্রয়োজন ছিল। ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে ৩-২ গোলের জয়ের পথে প্রথমে দুইবার দলকে সমতায় আনা এ ফুটবলার শেষ গোলটি করেন তার বিখ্যাত বাইসাইকেল কিক থেকে। আর সেই গোলটি ফুটবলের অন্যতম ‘সিন্ড্রেলা’ মুহূর্ত হিসেবে সুপরিচিত। যা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় গোল হিসেবে আজও সেটি আলোচিত।

ব্রাজিলের জার্সিতে অমরত্ব

২০০২ সালে বিশ্বকাপ শিরোপা জেতার মাধ্যমে ব্রাজিলের হয়ে নিজের সেরাটা দেন রিভালদো। আক্রমণত্রয়ী রোনালদো, রিভালদো এবং রোনালদিনিয়োর সমন্বয়ে গড়া ব্রাজিলিও আক্রমণভাগের এ ফুটবলার দলের হয়ে প্রথম পাঁচ ম্যাচেই গোল করেন। আট গোলের কল্যাণে গোল্ডেন বুট শিরোপা জিতে নেন এ তারকা। ১৯৯৯ কোপা আমেরিকায় টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন এবং যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতাও ছিলেন। সেই দলের কোচ লুইজ ফেলিপে স্কোলারি পরবর্তীতে বলেছিলেন—মানুষ শুধু গোলগুলো মনে রাখে। কিন্তু পুরো দলের জন্য সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছিল রিভালদো।

অবসর ও উত্তরাধিকার

২০০৮ সালে তিনি মোগি মিরিম ক্লাবটি কিনে নেন। পরে ২০১৪-১৫ মৌসুমে ৪৩ বছর বয়সে আবার সেই ক্লাবের হয়ে খেলতে নামেন এবং নিজের ছেলে রিভালদিনিয়োর সঙ্গে একই ম্যাচে গোল করার বিরল কৃতিত্ব গড়েন। অবশেষে ২০১৫ সালে পেশাদার ফুটবলকে বিদায় জানান তিনি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও রিভালদো নিয়মিত নিজের জন্মভূমি রেসিফেতে ফিরে যান। শৈশবের পাউলিস্তা এলাকায় গেলে এখনও দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও সহিংসতার চিত্র তাকে আবেগপ্রবণ করে তোলে। কয়েক বছর আগে তিনি বলেছিলেন—একজন দরিদ্র শিশু হিসেবে পৃথিবীর সেরা খেলোয়াড় হওয়া, বিশ্বকাপ জেতা কিংবা বার্সেলোনার হয়ে খেলার কথা কখনও আমার মাথায় আসেনি। আমার স্বপ্ন ছিল শুধু সান্তা ক্রুজের হয়ে পেশাদার ফুটবলার হওয়া। আমার কাছে সেটাই ছিল যথেষ্ট। রিভালদোর জীবন প্রমাণ করে, সব মহান সাফল্যের শুরু বড় স্বপ্ন দিয়ে হয় না। কখনও কখনও সীমাহীন প্রতিকূলতার মধ্যেও নিষ্ঠা, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস মানুষকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে, যা তার নিজের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়।