টর্নেডো শিকারের বাস্তব গল্প: হলিউডের চেয়েও রোমাঞ্চকর
টর্নেডো শিকারের বাস্তব গল্প: হলিউডের চেয়েও রোমাঞ্চকর

আকাশে ঘুটঘুটে কালো মেঘ, মুহুর্মুহু বিদ্যুতের ঝলকানি আর কান ফাটানো বজ্রপাত। রেডিওতে বাজছে সতর্কবার্তা। যেকোনো মুহূর্তে আছড়ে পড়তে পারে ভয়ংকর টর্নেডো! সাধারণ মানুষ যখন জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটছে, তখন একদল মানুষ নিজেদের শক্তিশালী গাড়ি নিয়ে উল্টো তীব্র বেগে ছুটে যাচ্ছে সেই ভয়ংকর ঝড়ের দিকেই!

হলিউডের বিখ্যাত টুইস্টার মুভির দৃশ্য যারা দেখেছেন, তাদের কাছে এটি খুব চেনা মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবেও কি এমনটা ঘটে? সত্যিই কি একদল মানুষ নিজেদের জীবন বাজি রেখে ঝড়ের পিছু ধাওয়া করে? হ্যাঁ, বাস্তবেও এমনটা ঘটে। যারা এই কাজ করেন, তাদের বলা হয় স্টর্ম চেজার। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত আবহাওয়াবিদ এবং গত ২০ বছর ধরে ঝড়ের পিছু ধাওয়া করা বাস্তব জীবনের স্টর্ম চেজার সাইরেনা আর্নল্ডের অভিজ্ঞতার আলোকে এই ভয়ংকর সুন্দর জগতের আসল গল্প জানা যাক।

স্টর্ম চেজিং কী এবং কেন?

স্টর্ম চেজিং বলতে মূলত তীব্র বজ্রঝড়ের পিছু নেওয়াকে বোঝায়, যেখান থেকে টর্নেডো তৈরি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে। যদিও পৃথিবীর নানা দেশেই টর্নেডো হয়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মতো এত ভয়ংকর ও ঘন ঘন টর্নেডো আর কোথাও দেখা যায় না। দেশটিতে মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে টর্নেডোর দাপট সবচেয়ে বেশি থাকে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যারা ঝড়ের পিছু নেন, তাদের মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। এক. শখের চেজার বা ফটোগ্রাফার। এই দলের মানুষজন মূলত দারুণ রোমাঞ্চ এবং ঝড়ের ভয়ংকর সুন্দর রূপ ক্যামেরায় বন্দী করার জন্য ঝড়ের পিছু নেন। দ্বিতীয় দলে আছেন আবহাওয়াবিদ ও বিজ্ঞানী। তারা ঝড়ের একদম কাছাকাছি গিয়ে বাতাসের গতিবেগ, দিক এবং বৃষ্টির পরিমাণ মাপেন। কারণ, অত্যাধুনিক রাডারও অনেক সময় মাটির কাছাকাছি থাকা ঝড়ের আসল পরিস্থিতি বুঝতে পারে না। এই বিজ্ঞানীরা জীবন বাজি রেখে যে তথ্য সংগ্রহ করেন, তার ওপর ভিত্তি করেই ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস সতর্কবার্তা জারি করে। অর্থাৎ এই স্টর্ম চেজাররা পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচান!

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মুভি বনাম বাস্তবতা

এবার আসল প্রশ্নে ফেরা যাক। মুভির সঙ্গে টর্নেডোর বাস্তবে কতটা মিল? সাইরেনার মতে উত্তর—হ্যাঁ এবং না! মুভিতে দেখা যায়, নায়কেরা গাড়িতে উঠলেন, আধা ঘণ্টা ড্রাইভ করলেন আর চোখের সামনে বিশাল এক টর্নেডো পেয়ে গেলেন! কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা মোটেও এত সহজ নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আবহাওয়া মডেল বিশ্লেষণ করে শত শত মাইল ড্রাইভ করার পর হয়তো একটা ঝড়ের দেখা মেলে। পরিসংখ্যান বলে, গড়ে ১০ বার স্টর্ম চেজ করতে গেলে হয়তো মাত্র একবার টর্নেডোর দেখা পাওয়া যায়!

আরেকটি বড় অমিল হলো চেজারদের মধ্যকার সম্পর্ক। মুভিতে দেখা যায়, এক দলের সঙ্গে আরেক দলের চরম রেষারেষি। কিন্তু বাস্তবে এই চেজারদের মধ্যে রয়েছে দারুণ বন্ধুত্ব। দীর্ঘ যাত্রাপথে কোনো গ্যাস স্টেশনে বা পেট্রলপাম্পে দেখা হয়ে গেলে তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন, একসঙ্গে আবহাওয়ার মডেল বিশ্লেষণ করেন এবং হাসিঠাট্টায় মেতে ওঠেন।

বিপদের মুখোমুখি

তবে বিপদের কথা কিন্তু এখনো বলিনি। ঝড়ের পিছু নিতে গিয়ে সবচেয়ে বড় ভয় শুধু টর্নেডোতে নয়! টর্নেডোর চেয়েও বড় বিপদ লুকিয়ে থাকে অন্য জায়গায়। তীব্র বজ্রপাত, বিশাল আকৃতির শিলাবৃষ্টি এবং সবচেয়ে ভয়ংকর হলো হঠাৎ বন্যা বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড। সাইরেনা জানান, আবহাওয়া বিপর্যয়ে যত মানুষ মারা যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় এই আকস্মিক বন্যায়। এর পাশাপাশি থাকে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারানো বা কাদায় আটকে যাওয়ার মতো বিপদ।

সাইরেনার অভিজ্ঞতা

সাইরেনার আবহাওয়া নিয়ে পাগলামি শুরু হয়েছিল পাঁচ বছর বয়স থেকে। ছোটবেলায় তিনি নিজের চোখের সামনে বাড়ির দরজা থেকে প্রথম টর্নেডো তৈরি হতে দেখেছিলেন। এর পর থেকে এই ভয়ংকর সুন্দর রূপ তাকে আকর্ষণ করেছে সব সময়।

২০০৩ সালের মে মাসের এক ভয়ংকর ঝড়ের কথা তিনি কখনোই ভুলতে পারেন না। নিউ মেক্সিকো শহরের ওই ঝড়ের নাম তারা দিয়েছিলেন ‘টিনা’। ঝড়টি এতটাই খ্যাপাটে ছিল যে এর ভেতরের দিকে বাতাসের একটানা গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৬৭ মাইল। ঝড়টি নিজের ভেতরে এত বিশাল শিলা তৈরি করেছিল যে পুরো মেঘের রং অদ্ভুত নীলচে-সবুজ আকার ধারণ করেছিল।

আরেকবার রাতের অন্ধকারে ঝড় তাড়া করতে গিয়ে ঘটেছিল এক অদ্ভুত ঘটনা। ওকলাহোমার এক রাতে তারা ঝড়ের খুব কাছাকাছি ছিলেন। সাইরেন বাজছিল, কিন্তু অন্ধকারে তারা টর্নেডো দেখতে পাচ্ছিলেন না। বাধ্য হয়ে তারা পিছু হটেন। রাতে যখন তারা নিজেদের ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওটি ভালো রেজল্যুশনে দেখলেন, তখন সবার চোখ কপালে! কারণ, পুরোটা সময় বিশাল এক টর্নেডো ঠিক তাদের চোখের সামনেই ঘুরপাক খাচ্ছিল, যা তারা অন্ধকারে টেরই পাননি!

প্রকৃতির এই চরম রুদ্র রোষের সামনে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানীরা এভাবেই দিনের পর দিন মানুষের জীবন বাঁচানোর লড়াই করে যাচ্ছেন!

সূত্র: পপুলার সায়েন্স