বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে কিছু দেশ ট্রফি জিতেছে, আর কিছু দেশ ট্রফি না জিতেও ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। নেদারল্যান্ডস এবং সুইডেন সেই দুই নাম, যাদের সৌন্দর্য, বেদনা, ব্যর্থতা, পুনর্জন্ম আর অসমাপ্ত স্বপ্নের দীর্ঘ অধ্যায় রয়েছে।
নেদারল্যান্ডস: সৌন্দর্যের অপূর্ণতা
নেদারল্যান্ডসকে অনেকে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতার উদাহরণ বলে। ছোট একটি দেশ, কিন্তু ফুটবলে তাদের প্রভাব এত গভীর যে বিশ্ব ফুটবলের কৌশল, দর্শন ও আক্রমণাত্মক চিন্তাধারা বদলে দেওয়ার আলোচনায়ও তাদের নাম চলে আসে। এত সাফল্য, প্রতিভা থাকার পরেও বিশ্বকাপ ট্রফি তাদের হাতে ওঠেনি।
ডাচদের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৩৪ সালে ইতালিতে। প্রথম আসরেই বিদায় নিতে হয়েছিল। এরপর ১৯৩৮ সালের পর দীর্ঘ ৩৬ বছর বিশ্বকাপের বাইরে কাটে তাদের। কিন্তু ১৯৭৪ সালে তারা ফিরে এসে বিশ্ব ফুটবলের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিল।
সেই দলের তারকা ছিলেন ক্রুইফ। তার নেতৃত্বে জন্ম নেয় টোটাল ফুটবল। নেদারল্যান্ডস সেই বিশ্বকাপে ফাইনালে ওঠে এবং পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে শুরুতেই এগিয়েও ছিল। শেষ পর্যন্ত ২–১ ব্যবধানে হার। ইতিহাস তাদের মনে রাখে, ট্রফি নয়।
১৯৭৮ সালে আবারও ফাইনাল। এবার প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা। ক্রুইফ ছিলেন না, কিন্তু ডাচরা আবার শেষ মঞ্চে। অতিরিক্ত সময়ে হার। দুই বিশ্বকাপ, দুই ফাইনাল, দুই অপূর্ণতা।
এরপর সময়, প্রজন্ম বদলেছে। এসেছে ডেনিস বার্গকাম্প, রুড গুল্লিত, রবিন ফন পার্সি, ওয়েসলি স্নেইডার, আরইয়েন রবেন। ১৯৯৮ সালে সেমিফাইনাল, ২০১০ সালে আবার ফাইনাল। দক্ষিণ আফ্রিকার সেই রাতে স্পেনের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে হার। আরও একবার শিরোপা ছুঁয়েও ফিরে আসা।
২০১৪ বিশ্বকাপে ডাচরা আবার নিজেদের প্রমাণ করে। ব্রাজিলে তারা সেমিফাইনাল পর্যন্ত যায় এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করে। আর ২০২২ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল। নেদারল্যান্ডস এখন পর্যন্ত তিনবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছে, কিন্তু একবারও চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। তবুও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা দলগুলোর একটি হয়ে আছে।
সুইডেন: ধৈর্য ও শৃঙ্খলার প্রতীক
অন্যদিকে সুইডেন বিশ্বকাপে প্রথম খেলে ১৯৩৪ সালে। অভিষেক ম্যাচেই তারা ফাইনালিস্ট আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে সবাইকে চমকে দেয়।
সুইডেনের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ আসে ১৯৫৮ সালে। সেই বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল তারাই। পুরো দেশ উৎসবে ভেসে যায়। সুইডেন একে একে প্রতিপক্ষ পেরিয়ে ফাইনালে ওঠে। আর সেখানে অপেক্ষায় ছিল ফুটবলের নতুন এক বিস্ময় ব্রাজিল ও তরুণ পেলে। ফাইনালে সুইডেন শুরুতে এগিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত ৫–২ ব্যবধানে হারে। কিন্তু রানার্সআপ হওয়াই এখনও তাদের সেরা বিশ্বকাপ অর্জন।
এরপর বহু বছর সুইডেন বিশ্ব ফুটবলে ওঠানামা করেছে। তবে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ তাদের ইতিহাসে আরেকটি সোনালি অধ্যায়। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত সেই আসরে সুইডেন সেমিফাইনালে পৌঁছে তৃতীয় স্থান অর্জন করে।
পরবর্তী সময়ে হেনরিক লারসন, জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ, এমিল ফোর্সবার্গদের মতো তারকারা সুইডিশ ফুটবলকে নতুন পরিচয় দিয়েছেন। ২০১৮ সালে সুইডেন আবার বিশ্বমঞ্চে ফিরে এসে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছায়।
মিল ও ভিন্নতা
নেদারল্যান্ডস আর সুইডেন দুটি দেশের ইতিহাস আলাদা। একজন সৌন্দর্যের বিপ্লব ঘটিয়েছে, আরেকজন ধৈর্য আর শৃঙ্খলার প্রতীক হয়েছে। কিন্তু তাদের মিল এক জায়গায়: বিশ্বকাপ শুধু ট্রফি নয়, ইতিহাসও। সেই ইতিহাসে এই দুই দলের নাম লেখা আছে মর্যাদার সঙ্গে।



