মন্টি হল প্যারাডক্স: দরজা বদলালে কেন দ্বিগুণ হয় জেতার সম্ভাবনা?
মন্টি হল প্যারাডক্স: দরজা বদলালে দ্বিগুণ জেতার সম্ভাবনা

মন্টি হল প্যারাডক্স এমন একটি ধাঁধা যা শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বড় বড় গণিতবিদদেরও রীতিমতো ঘোল খাইয়ে ছেড়েছিল। এই প্যারাডক্সের শেকড় লুকিয়ে আছে বার্ট্রান্ড বক্স প্যারাডক্সের ভেতরে, যা কন্ডিশনাল প্রবাবিলিটি বা শর্তসাপেক্ষ সম্ভাবনার একটি উদাহরণ। ১৯৫৯ সালে সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগাজিনে মার্টিন গার্ডনার ‘থ্রি প্রিজনার্স প্রবলেম’ নামে একটি ধাঁধা প্রকাশ করেছিলেন, যার আধুনিক রূপই এই মন্টি হল প্যারাডক্স।

মন্টি হল প্যারাডক্সের উৎপত্তি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘লেটস মেক আ ডিল’ নামে একটি জনপ্রিয় টিভি গেম শো হতো, যার সঞ্চালক ছিলেন কানাডিয়ান বংশোদ্ভূত ক্যারিশম্যাটিক উপস্থাপক মন্টে হল, যিনি পরে নিজের নাম বদলে মন্টি রাখেন। তাঁর নাম অনুসারেই এই ধাঁধার নামকরণ। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বার্কলি) পরিসংখ্যানের অধ্যাপক স্টিভ সেলভিন ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য আমেরিকান স্ট্যাটিস্টিশিয়ান জার্নালে মাত্র আধা পৃষ্ঠার একটি লেখা ছাপিয়েছিলেন, যেখানে এই প্যারাডক্সের বর্ণনা ছিল। তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি যে তাঁর ওই ছোট্ট লেখাটি এত বড় আলোড়ন তুলবে।

১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরে আমেরিকায় এক কোটির বেশি বিক্রি হওয়া সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন প্যারেড-এর ‘আস্ক মেরিলিন’ কলামে মেরিলিন ভস সাভান্ত নামে এক নারী পাঠকদের নানা গাণিতিক ধাঁধার উত্তর দিতেন। আশির দশকে গিনেস বুকে বিশ্বের সর্বোচ্চ আইকিউ (১৮৫) সম্পন্ন মানুষ হিসেবে তাঁর নাম উঠেছিল। ওই কলামে ক্রেগ এফ হুইটেকার নামে এক পাঠক সেলভিনের সেই মন্টি হল প্যারাডক্সের একটি পরিমার্জিত রূপ মেরিলিনকে জিজ্ঞেস করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মেরিলিনের উত্তর ও গণিতবিদদের প্রতিক্রিয়া

মেরিলিন যখন এই ধাঁধার উত্তর দিলেন, তখন তা সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনার ঠিক উল্টো হলো। তাঁর উত্তরটি শতভাগ নিখুঁত হওয়া সত্ত্বেও সারা দেশ থেকে শত শত গণিতবিদ তাঁকে ভুল প্রমাণ করতে হামলে পড়লেন। ম্যাগাজিনের দপ্তরে ক্ষুব্ধ গণিতবিদদের চিঠির পাহাড় জমে গেল। কিছু চিঠির উদ্ধৃতি:

  • “পেশাদার গণিতবিদ হিসেবে সাধারণ মানুষের গণিতের এই দৈন্যদশা দেখে আমি খুব চিন্তিত। দয়া করে নিজের ভুল স্বীকার করুন এবং ভবিষ্যতে আরও সতর্ক হোন।”
  • “আপনি একটি বিশাল ভুল করেছেন! মনে হচ্ছে এই ধাঁধার পেছনের সাধারণ নিয়মটাই আপনি বুঝতে পারছেন না।”
  • “এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আপনি বরং সম্ভাবনার ওপর লেখা কোনো সাধারণ পাঠ্যবই পড়ে নিতে পারেন।”
  • “আমি রীতিমতো ঘোরের মধ্যে আছি! অন্তত তিনজন গণিতবিদ আপনার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার পরও আপনি নিজের ভুল বুঝতে পারছেন না!”
  • “হতে পারে নারীরা গণিতের সমস্যাগুলোকে পুরুষদের চেয়ে একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেন।”

মজার ব্যাপার হলো, পরে এই সব মানুষেরই লজ্জায় মুখ লুকানোর উপক্রম হয়েছিল। মেরিলিন পরের একটি সংখ্যায় আবারও একই উত্তর দেন এবং ১৮৫ আইকিউসম্পন্ন মানুষের মতোই দুর্দান্ত যুক্তিতে প্রমাণ করে দেন, তিনিই ঠিক! বিষয়টি এতই আলোড়ন তুলেছিল যে শেষ পর্যন্ত তা নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রথম পাতায় জায়গা করে নেয়।

স্টিভ সেলভিনের মূল ধাঁধা

স্টিভ সেলভিনের বর্ণনায় টিভি শোয়ের দৃশ্যপটটি ছিল ঠিক এ রকম: আপনার সামনে A, B এবং C লেবেল লাগানো তিনটি বাক্স। এর মধ্যে যেকোনো একটির ভেতরে ১৯৭৫ সালের নতুন লিঙ্কন কন্টিনেন্টাল গাড়ির চাবি রাখা আছে। বাকি দুটি বাক্স একদম খালি। প্রতিযোগী বাক্স B বেছে নিলেন। মন্টি হল টেবিলের ওপর থাকা বাকি দুটি বাক্স থেকে একটি খুলে দেখালেন, যা খালি। তারপর তিনি প্রতিযোগীকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি সিদ্ধান্ত বদলে টেবিলের ওপর থাকা অন্য বাক্সটি নিতে চান?

প্রথম প্রমাণ: সম্ভাবনার হিসাব

সবচেয়ে নিখুঁত গাণিতিক প্রমাণ হলো: আপনি যদি সিদ্ধান্ত না বদলান, গাড়ি যদি A-এর পেছনে থাকে এবং উপস্থাপক B বা C যেটাই খুলুক না কেন, আপনি জিতবেন। কিন্তু গাড়ি যদি B-এর পেছনে থাকে, তাহলে উপস্থাপক বাধ্য হয়ে C খুলবেন। আপনি A-তেই অটল থাকায় হারবেন। আবার গাড়ি যদি C-এর পেছনে থাকে, তাহলে উপস্থাপক বাধ্য হয়ে B খুলবেন। আপনি A-তেই অটল থাকায় হারবেন। অর্থাৎ, নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলে আপনি ৩ বারের মধ্যে মাত্র ১ বার জিতবেন।

এবার ধরুন, আপনি সব সময় সিদ্ধান্ত বদলাবেন। গাড়ি যদি A-এর পেছনে থাকে, তাহলে উপস্থাপক B বা C খুলবেন। আপনি সিদ্ধান্ত বদলে খালি দরজায় যাবেন এবং হারবেন। কিন্তু গাড়ি যদি B-এর পেছনে থাকে, তাহলে উপস্থাপক বাধ্য হয়ে ছাগলওয়ালা দরজা C খুলবেন। আপনি তখন A থেকে সিদ্ধান্ত বদলে B-তে যাবেন এবং জিতবেন! আবার গাড়ি যদি C-এর পেছনে থাকে, তাহলে উপস্থাপক বাধ্য হয়ে ছাগলওয়ালা দরজা B খুলবেন। আপনি তখন A থেকে সিদ্ধান্ত বদলে C-তে যাবেন এবং জিতবেন! সিদ্ধান্ত বদলালে আপনি ৩ বারের মধ্যে ২ বারই জিতছেন। জেতার সম্ভাবনা সোজাসুজি দ্বিগুণ!

দ্বিতীয় প্রমাণ: ১০০০ দরজার উদাহরণ

গণিতের মারপ্যাঁচ ভালো না লাগলে এই উদাহরণটি আপনার জন্য। ধরুন, তিনটি নয়, আপনার সামনে ১০০০টি দরজা আছে! একটির পেছনে গাড়ি আর ৯৯৯টির পেছনে ছাগল। আপনি একটি দরজা (ধরুন দরজা নং ৭৭৭) বেছে নিলেন। এখানে আপনার গাড়ি পাওয়ার সম্ভাবনা ১০০০ ভাগের মাত্র ১ ভাগ। এবার সবজান্তা উপস্থাপক আপনার দরজাটি বাদে বাকি ৯৯৮টি দরজা খুলে দিলেন এবং সবগুলোর পেছনেই ছাগল বেরোল! এখন আপনার সামনে শুধু আপনার বেছে নেওয়া দরজা ৭৭৭ এবং উপস্থাপকের না খোলা একটি দরজা (ধরুন ২৩৮ নম্বর) বন্ধ আছে। আপনার প্রথম সিদ্ধান্তে গাড়ি থাকার সম্ভাবনা ছিল ১/১০০০। বাকি ৯৯৯টি দরজার কোথাও গাড়ি থাকার সম্ভাবনা ছিল ৯৯৯/১০০০। উপস্থাপক ৯৯৮টি দরজা খুলে দিলেও সম্ভাবনা কিন্তু কমে যায়নি, পুরো ৯৯৯/১০০০ সম্ভাবনার সবটুকু ভার এসে পড়েছে ওই বেঁচে যাওয়া একটি দরজা ওপর! অর্থাৎ ২৩৮ নম্বর দরজার ওপর!

তৃতীয় প্রমাণ: পূর্বজ্ঞানের ম্যাজিক

এই বিষয়টি আরও একটু পরিষ্কার করার জন্য বিড়ালের ছানার একটা গল্প বলা যাক। ধরুন আপনি দুটি বিড়াল ছানা কিনতে চান। দোকানের মালিক আপনাকে ফোন করে জানালেন, তাঁর কাছে আজই দুটি ভাইবোন বিড়াল এসেছে—একটি কালো রঙের এবং একটি ডোরাকাটা রঙের। আপনি জানতে চাইলেন তারা ছেলে নাকি মেয়ে। দোকানের মালিকের দুটি ভিন্ন উত্তরের দিকে খেয়াল করুন: (ক) ‘আমি শুধু একটি ছানা চেক করেছি। সেটি ছেলে।’ অন্য কোনো তথ্য ছাড়া এখন দুটি ছানাই ছেলে হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? (খ) ‘আমি ডোরাকাটা বিড়ালটিকে চেক করেছি, ওইটা ছেলে।’ এবার দুটি ছানাই ছেলে হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?

(ক) নম্বর ক্ষেত্রে মালিক শুধু বলেছেন ‘অন্তত একটি ছেলে।’ এর মানে ৪ নম্বর অপশনটি (দুটিই মেয়ে) বাদ। বাকি ৩টি অপশনের যেকোনোটি হতে পারে। তাই দুটিই ছেলে হওয়ার সম্ভাবনা হলো ৩ ভাগের ১ ভাগ। কিন্তু (খ) নম্বর ক্ষেত্রে যখন তিনি সুনির্দিষ্ট করে বলে দিলেন, ‘ডোরাকাটাটি ছেলে’, তখন আপনার কাছে একটি বাড়তি তথ্য চলে এল। এই তথ্যের কারণে ২ নম্বর অপশন (যেখানে ডোরাকাটাটি মেয়ে) এবং ৪ নম্বর অপশন সরাসরি বাতিল হয়ে গেল! বাকি থাকল শুধু ১ নম্বর এবং ৩ নম্বর অপশন। অর্থাৎ, এখন দুটিই ছেলে হওয়ার সম্ভাবনা হলো ২ ভাগের ১ ভাগ বা অর্ধেক! ঠিক এভাবেই একটি নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাবনা এক-তৃতীয়াংশ থেকে বেড়ে অর্ধেক হয়ে যায়। মন্টি হল প্যারাডক্সে উপস্থাপক যখন ইচ্ছা করে একটি নির্দিষ্ট দরজা খোলেন, তখন তিনিও আপনাকে এমন একটি সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে দেন, যা হিসাবটাকে পাল্টে দেয়।

চতুর্থ প্রমাণ: উপস্থাপক যদি না জানতেন

কট্টর অবিশ্বাসীরা হয়তো এখনো বলবেন, বিড়ালের দোকানের মালিক তো আপনাকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন, মন্টি হল তো তা করেননি। তাহলে চলুন হিসাব একটু বদলে দিই। মন্টি হল যদি না জানতেন কোথায় গাড়ি আছে, তখন কী হতো? ধরুন, এই গেম শোটি আপনি ১৫০ বার খেললেন। একজন বিচারক প্রতিবার গাড়িটি লুকিয়ে রাখেন, মন্টি নিজেও জানেন না গাড়ি কোথায়। আপনি প্রতিবার দরজা A বেছে নিলেন। মন্টি প্রতিবার দৈবচয়নে বাকি দুটি থেকে একটি দরজা খুললেন। যেহেতু তিনি জানেন না গাড়ি কোথায়, তাই গড়ে ১৫০ বারের মধ্যে ৫০ বার তিনি গাড়িওয়ালা দরজাই খুলে ফেলবেন! তখন তো খেলা সেখানেই শেষ, আপনার আর জেতার কোনো সুযোগই নেই। বাকি ১০০ বার তিনি ছাগলওয়ালা দরজা খুলবেন। এই ১০০ বারের মধ্যে ৫০ বার গাড়ি থাকবে আপনার দরজা A-এর পেছনে, বাকি ৫০ বার থাকবে দরজা C-এর পেছনে। অর্থাৎ, উপস্থাপক যদি না জানেন, তবেই কেবল সম্ভাবনা ঠিক অর্ধেক হয়। তখন সিদ্ধান্ত বদলালে যা, না বদলালেও তা-ই। কিন্তু মন্টি হল তো জানেন! তাই তিনি কখনোই ওই প্রথম ৫০ বার গাড়িওয়ালা দরজা খুলে নিজের ভুল করবেন না। তিনি সব সময় ছাগলওয়ালা দরজাই খুলবেন। এ কারণেই সিদ্ধান্ত বদলালে আপনার জেতার সম্ভাবনা ওই দুই-তৃতীয়াংশ থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যাবে।

নিজেই পরীক্ষা করে দেখুন

মেরিলিন ভস সাভান্ত তাঁর কলামে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্কুলে এই ধাঁধার ওপর ১০০০টিরও বেশি পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। প্রতিবারই প্রমাণিত হয়েছে, সিদ্ধান্ত বদলানোই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। জিম আল-খলিলি তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘আমারও একবার ঠিক এই অভিজ্ঞতাই হয়েছিল। বিবিসির একটি বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যচিত্রের শুটিংয়ের কাজে দীর্ঘ গাড়িযাত্রায় আমার ক্যামেরাম্যান অ্যান্ডি জ্যাকসনকে এই প্যারাডক্সটি বোঝাচ্ছিলাম। সে কিছুতেই বিশ্বাস করছিল না। বাধ্য হয়ে আমি তাসের প্যাকেট বের করলাম। একটি লাল তাস (গাড়ি) এবং দুটি কালো তাস (ছাগল) নিলাম। তাসগুলো উল্টে রেখে তাকে একটা তাস বাছতে বললাম। আমি নিজে যেহেতু জানতাম লাল তাসটি কোথায়, তাই আমি ইচ্ছা করে একটি কালো তাস উল্টে দিলাম। তারপর তাকে সিদ্ধান্ত বদলানোর সুযোগ দিলাম। মাত্র ২০ বার খেলার পরই অ্যান্ডি অবাক হয়ে দেখল, সিদ্ধান্ত বদলানোর ফলে সে প্রায় দ্বিগুণ বার লাল তাসটি জিতে নিচ্ছে! সে হয়তো অঙ্কের লজিকটা পুরোপুরি বোঝেনি, কিন্তু এটা মেনে নিয়েছিল যে আমিই সঠিক।’