দিনাজপুরের হিলি বাজারে বোরো মৌসুমের ভরা সময়ে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। প্রকারভেদে প্রতি কেজি চালের দাম ৭ থেকে ১৪ টাকা পর্যন্ত বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের ও খেটে খাওয়া মানুষ। বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিংয়ের দাবি জানিয়েছেন ভোক্তারা।
ব্যবসায়ীদের দাবি: সিন্ডিকেট ও মজুতদারি
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিলারদের সিন্ডিকেট, মজুতদারি এবং আমদানিকৃত চালের সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে দাম বেড়েছে। তবে মিলার ও আমদানিকারকদের দাবি, চাল আমদানি বন্ধ থাকা এবং সরকারি খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহের চাপ বাড়ার কারণে বাজারে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
উৎপাদন ভালো হলেও দাম কমছে না
বর্তমানে দেশে বোরো ধান কাটার মৌসুম চলছে। অনেক এলাকায় কৃষক এখনও মাঠ থেকে ধান সংগ্রহ করছেন। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে উৎপাদনও ভালো হয়েছে। নতুন চাল বাজারে এলেও দাম কমানোর পরিবর্তে উল্টো বেড়েছে।
বিভিন্ন চালের বর্তমান দাম
হিলি বাজার ঘুরে দেখা যায়, আমদানিকৃত শম্পাকাটারি চাল বর্তমানে প্রতি কেজি ৭৮ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ৬৩ থেকে ৬৫ টাকা। স্বর্ণা চালের দাম বেড়ে হয়েছে ৫২ থেকে ৫৪ টাকা, যা আগে ছিল ৪৬ টাকা। দেশীয় মিনিকেট চাল প্রকারভেদে ৬৪ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল প্রায় ৬০ টাকা।
ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া
চাল কিনতে আসা তারিকুল ইসলাম বলেন, “কয়েকদিন আগে ২৫ কেজির এক বস্তা চাল ১ হাজার ১৫০ টাকায় কিনেছি। এখন একই বস্তা কিনতে ১ হাজার ৩০০ টাকা লাগছে। ২০-২৫ দিনের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি ১৫০ টাকা বেড়ে যাওয়া আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষের জন্য বড় চাপ। বাজার মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন।”
শ্রমজীবী আব্দুল খালেক বলেন, “কয়েকদিন আগেও যে চাল ৫০ টাকা কেজি ছিল, এখন সেটি ৫৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে সাধারণ মানুষের পক্ষে চাল কেনা কঠিন হয়ে পড়বে।”
হায়দার আলী নামে আরেক ক্রেতা বলেন, “দিন আনি দিন খাই। কয়েকদিনের ব্যবধানে চালের দাম কেজিতে ৫-৬ টাকা বেড়েছে। আয় বাড়েনি, কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। বাধ্য হয়ে চাহিদার তুলনায় কম চাল কিনতে হচ্ছে।”
চাল ব্যবসায়ীদের ব্যাখ্যা
হিলি বাজারের চাল ব্যবসায়ী সুব্রত কুণ্ডু বলেন, বর্ষা মৌসুমে অনেক হাসকিং মিল বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে অটো রাইস মিল মালিকরা ধান কিনে মজুত করছেন এবং নিজেদের সুবিধামতো দামে চাল বিক্রি করছেন। এছাড়া আমদানিকৃত চালের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, চালের দাম বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ হলো হাওর অঞ্চলে ধানের সংকট। আগে হাওর অঞ্চলের ধান উত্তরবঙ্গের অটোরাইস মিলে সরবরাহ হতো, কিন্তু এবার সেই ধান পর্যাপ্ত পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে উত্তরবঙ্গের ধানের ওপর চাপ বেড়েছে এবং এখানকার চাল হাওর অঞ্চলেও সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া আগে আমদানি হওয়া এলসির চালের একটি অংশ আমদানিকারকরা গুদামজাত করে রেখেছেন। বর্তমানে চাহিদা বাড়ায় তারা সেই চাল বেশি দামে বাজারে ছাড়ছেন। একদিকে অটোরাইস মিল মালিকরা চালের দাম বাড়াচ্ছেন, অন্যদিকে মজুত করা আমদানিকৃত চালও কম দামে বিক্রি করা হচ্ছে না। এসব কারণে বাজারে চালের দাম ক্রমাগত বাড়ছে।
আরেক ব্যবসায়ী অনুপ বসাক বলেন, “বোরোর ভরা মৌসুমেও চালের দাম বাড়ার পেছনে মিলারদের কারসাজি রয়েছে। তারা কম দামে ধান কিনে বেশি দামে চাল বিক্রি করছেন। ফলে পাইকারি বাজার থেকেই আমাদের বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে। এলসির চাল বাজারে এলে দাম কিছুটা কমতে পারে।”
মিল মালিক ও আমদানিকারকদের মত
দুদু হাসকিং মিলের মালিক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ ছোট হাসকিং ও সেমি-অটো মিল বন্ধ রয়েছে। সরকারি খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহের কারণে অটো রাইস মিলগুলো মূলত মোটা চাল উৎপাদনে ব্যস্ত। এতে চিকন চালের সরবরাহ কমে গেছে। সরকারি বরাদ্দের চাল সরবরাহ শেষ হলে বাজার স্বাভাবিক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
চাল আমদানিকারক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাওর অঞ্চলে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধানের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া গত ১০ মার্চ থেকে চাল আমদানি কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “বর্তমানে স্বর্ণা চালের দাম কেজিতে প্রায় ৭ টাকা এবং শম্পাকাটারি চালের দাম ১৩ থেকে ১৪ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আমদানি পুনরায় শুরু হলে বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
ভোক্তাদের দাবি
স্থানীয় ভোক্তাদের দাবি, বোরো মৌসুমে যখন বাজারে নতুন ধান ও চাল আসার কথা, তখন উল্টো দাম বৃদ্ধি অস্বাভাবিক। তাই বাজারে নজরদারি বাড়িয়ে চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।



