মিকেল মেরিনো। নামটি এখন স্পেনের প্রতিটি ফুটবলপ্রেমীর মুখে। চলতি বিশ্বকাপে পর্তুগালের বিপক্ষে রাউন্ড অব ১৬-তে অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে তার হেড করা গোল স্পেনকে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট এনে দিয়েছে। সেই গোলের পর সমর্থকেরা তাকে ‘মিস্টার লাস্ট মিনিট’ নামে ডাকতে শুরু করেছেন।
শৈশব ও ফুটবল শিক্ষা
১৯৯৬ সালের ২২ জুন স্পেনের নাভারা অঞ্চলের ঐতিহাসিক শহর পাম্পলোনায় জন্ম মিকেল মেরিনোর। তার বাবা মিগেল মেরিনো ছিলেন পেশাদার ফুটবলার, যিনি ওসাসুনা ও সেল্তা ভিগোর মতো ক্লাবে খেলেছেন। ছোটবেলা থেকেই মেরিনোর খেলনা ছিল ফুটবল। বাবার হাত ধরেই তিনি প্রথম মাঠে পা রাখেন। তবে ফুটবল পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে প্রত্যাশার চাপও ছিল অনেক। সবাই জানতে চাইত, বাবার মতো খেলতে পারবে কি না।
ক্লাব ক্যারিয়ারের শুরু ও উত্থান
ওসাসুনার একাডেমিতে বেড়ে ওঠা মেরিনো ২০১৪ সালে ক্লাবটির হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক করেন। ছয় ফুট দুই ইঞ্চি উচ্চতার এই মিডফিল্ডার ‘বক্স-টু-বক্স’ খেলার জন্য পরিচিত। রক্ষণে ট্যাকল এবং আক্রমণে গোল করার ক্ষমতা তাকে বিশেষ করে তুলেছে।
২০১৭ সালে তিনি ডর্টমুন্ডে যোগ দেন, কিন্তু নতুন দেশ ও ভাষার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়। এক মৌসুম পর নিউক্যাসল ইউনাইটেডে পাড়ি জমান। প্রিমিয়ার লিগের কঠিন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না, তবে সাবেক কোচ রাফায়েল বেনিতেজ একবার বলেছিলেন, ‘মিকেলের সবচেয়ে বড় গুণ হলো সে শেখার জন্য সব সময় প্রস্তুত।’
রিয়াল সোসিয়েদাদে সোনালি অধ্যায়
২০১৮ সালে মেরিনো স্পেনে ফিরে রিয়াল সোসিয়েদাদে যোগ দেন। সেখানে তিনি দলের হৃদস্পন্দনে পরিণত হন। ছয় মৌসুমে ক্লাবকে কোপা দেল রে জিততে সাহায্য করেন এবং লা লিগার অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন। তার খেলার ধরন বহুমুখী—একই সঙ্গে রক্ষণ সামলানো, আক্রমণ গড়া এবং গোল করা।
জাতীয় দলে অবদান ও ইউরো ২০২৪
স্পেন জাতীয় দলেও ধীরে ধীরে অপরিহার্য হয়ে ওঠেন মেরিনো। ২০২৪ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে জার্মানির বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের শেষদিকে করা তার হেড স্পেনের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কখনো ব্যক্তিগত নায়ক হতে চাই না। আমি চাই, ম্যাচ শেষে সবাই বলুক স্পেন জিতেছে।’
আর্সেনালে যোগদান
২০২৪ সালের পর ইউরোপের শীর্ষ ক্লাব আর্সেনাল তাকে দলে ভেড়ায়। লন্ডনে এসে প্রিমিয়ার লিগ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের চাপের মধ্যেও নিজের স্বাভাবিক খেলা চালিয়ে যান তিনি।
বিশ্বকাপ ২০২৬-এ নায়ক
বিশ্বকাপে আসার আগে খুব কম মানুষই তাকে স্পেনের সম্ভাব্য নায়কদের তালিকায় রেখেছিলেন। আলো ছিল লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, পেদ্রি বা ফ্যাবিয়ান রুইজদের ওপর। কিন্তু মেরিনো মাঠেই উত্তর দিয়েছেন। রাউন্ড অব ১৬-তে পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছিল, শেষ মুহূর্তে বক্সে ঢুকে তার জয়সূচক গোল স্তব্ধ করে দেয় পুরো স্টেডিয়াম।
ম্যাচ শেষে শান্ত কণ্ঠে মেরিনো বলেছিলেন, ‘ফুটবলে নায়ক একজন নয়। মাঠে নামা প্রতিটি খেলোয়াড়, বেঞ্চে বসা প্রতিটি সতীর্থ, কোচিং স্টাফরা সম্মিলিতভাবে একটি জয় তৈরি করে। আমি শুধু আমার কাজটা করেছি।’
ব্যক্তিগত জীবন ও দর্শন
মাঠের বাইরে মেরিনো অত্যন্ত সাধারণ মানুষ। পরিবার তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তার বাবা আজও ছেলের প্রতিটি ম্যাচ গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখেন। স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে একবার বলেছিলেন, ‘যেকোনো কোচ মিকেল মেরিনোর মতো একজন ফুটবলারকে নিজের দলে চাইবে। কারণ সে সব সময় দলের প্রয়োজনকে নিজের আগে রাখে।’
মেরিনো বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোলদাতাদের তালিকায় থাকবেন না, কিন্তু তিনি খেলেন দেশের পতাকাকে আরও একটু উঁচুতে ওড়ানোর জন্য। তিনি স্পেনের বিশ্বাস, সাহস আর নীরব হৃদস্পন্দন।



