মেসি-রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ: এক প্রজন্মের আবেগের গল্প
মেসি-রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ: প্রজন্মের আবেগ

প্রায় দুই যুগ হতে চলেছে মেসি রোনালদোর খেলা দেখে বড় হয়েছি। শৈশবের সেই ম্যানইউ-এর রোনালদো আর বার্সার মেসি, আজ তারা পৃথিবীর কোথাও না কোথাও ফুটবল খেলছে। আর তা আপনি জানেন। হয়তো সময়ের দাঁড়িপাল্লায় আপনার ব্যস্ততার ওজন বেশি হয়ে পড়েছে। তাই হয়তো খেলা দেখা হয় না। কিন্তু আপনার মনের কোনও এক কোণ জানে—তারা আছে, তারা খেলছে। কেউ হয়তো সমুদ্রের তীরে, আর কেউ হয়তো মরুর বুকে।

এই অনুভূতিটা আসলে শুধু খেলা না, এটা একটা সময়, একটা অভ্যাস, একটা আবেগ—যা ধীরে ধীরে আমরা যারা নব্বইয়ের দশকের বাচ্চাকাচ্চা, আমাদের বড় হওয়ার গল্পের সঙ্গে মিশে গেছে। রাত জেগে চ্যাম্পিয়নস লীগ দেখা, এল ক্লাসিকোর আগে বুক ধড়ফড় করা, বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক, গোল হলে চিৎকার, এসব শুধু মুহূর্ত না, এগুলো আমাদের প্রজন্মের যৌথ স্মৃতি। আমাদের প্রজন্ম ভাগ্যবান কারণ আমরা একসাথে দেখেছি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের ফুটবলারের শ্রেষ্ঠত্ব।

মেসি, যার বাম পা-টা যেন জাদুর ছড়ি, ড্রিবলিং যেন কবিতা, খেলা যেন শিল্প, একেকটা মোমেন্ট যেন জাদুকরের থার্ড অ্যাক্ট, উপস্থিত জনতার মুখ হাঁ করে দেওয়ার মতো দৃশ্য। আর ক্রিস্টিয়ানো, যার শরীরই যেন এক যন্ত্র, একটা ভবিষ্যতের সায়েন্স ফিকশন মুভির কোনও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, পরিশ্রম যার একমাত্র কাজ, আর জেতার ইচ্ছা যার সবচেয়ে বড় পরিচয়। জন্মগত প্রতিভা আর নির্মিত কিংবদন্তি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুজনই পৌঁছেছে একই শিখরে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

একটা বাস্তব ঘটনা প্রায়ই মনে পড়ে, মেসিকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তাকে বাদ দিয়ে বিশ্বের সেরা প্লেয়ার কে? সে নেইমার, এমবাপ্পে, সুয়ারেজসহ আরও নাম বলেছিল। তারপর যখন বলা হলো, রোনালদো? রোনালদোর কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মেসি হেসে বলেছিল "না না, আমি ওকে (ক্রিস্টিয়ানো) এই তালিকা থেকে সরিয়ে রেখেছি… ওকে আমার সঙ্গেই সরিয়ে রেখেছি।"

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই কয়েক লাইনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাদের সম্পর্কের আসল সংজ্ঞা, প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু একে অপরের মানদণ্ড। এই দুইজন শুধু ট্রফি জেতেনি, তারা ফুটবল দেখার ধরনটাই বদলে দিয়েছে। ব্যালন ডি'অর—যা একসময় অনেকের মধ্যে ভাগ হতো, সেটাকে তারা প্রায় একচেটিয়া করে ফেলেছিল এক দশকেরও বেশি সময়। ২০০৮ থেকে ২০১৭ এই সময়টা যেন শুধু তাদেরই ছিল। গোলের হিসেবে তারা অদ্ভুত রেকর্ডের অধিকারী, ২০০০-এর মত ক্যারিয়ার গোল, অসংখ্য হ্যাটট্রিক, রেকর্ডের পর রেকর্ড। কিন্তু সংখ্যার বাইরেও একটা ব্যাপার আছে ‘মুহূর্ত’।

রোনালদোর বাইসাইকেল কিক, বুলেট ট্রেনের মতো সলো রান, লং রেঞ্জ ফ্রিকিক, মেসির চার পাঁচ জনকে কাটিয়ে করা গোল, গোলকিপারের মাথার উপর দিয়ে হালকা চিপ, সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা ভিশন, ডিফেন্স বুঝে ওঠার আগেই বুক চিরে বের হওয়া সেই নিখুঁত পাস, এই মুহূর্তগুলোই আমাদের বারবার টিভির সামনে বসিয়েছে। এল ক্লাসিকো রিয়াল মাদ্রিদ বনাম বার্সেলোনা, একসময় শুধু একটা ম্যাচ ছিল না, এটা ছিল একটা যুদ্ধ, একটা অনুভূতি, একটা বিশ্বব্যাপী ইভেন্ট। দুইজন দুই দলে, কিন্তু পুরো পৃথিবী ভাগ হয়ে যেত দুই ভাগে।

তবু সময় থেমে থাকে না। ধীরে ধীরে তারা ইউরোপ ছেড়েছে একজন গেছেন মরুর দেশে, অন্যজন ফিরে গেছে বাড়ির কাছাকাছি। তবু অদ্ভুতভাবে তাদের গল্প থামেনি, শুধু প্রেক্ষাপট বদলেছে। কিন্তু একটা প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে, তারা অবসর নিলে কী হবে? ফুটবল তো থেমে থাকবে না, এটা নিশ্চিত। নতুন তারকা আসবে এম্বাপ্পে, লামিন, হালান্ড, অলিসে, নিকো পাজ, আলভারেজ নিজেদের গল্প লিখবে। কিন্তু ‘গ্রেটেস্ট অব অল টাইম’ নিয়ে যে আবেগ, যে বিভাজন, যে তর্ক সেটা কি আবার একইভাবে ফিরে আসবে? নাকি এটা শুধু আমাদের প্রজন্মের জন্যই এক বিশেষ অধ্যায় হয়ে থাকবে?

আমি জানি না, আমি সেই দিন কী করবো। মেসি রোনালদো অবসরে গেলে হয়তো একদিন ডে অফ নেবো ব্যস্ততা থেকে। হয়তো অভিমানে বার্সার খেলা দেখা এক সপ্তাহ বন্ধ রাখবো। হয়তো ইউটিউবে পুরোনো ম্যাচ চালিয়ে বসে থাকবো, ফিরে যাবো ২০০৯, ২০১১, ২০১৪ যখন সবকিছু স্বপ্নের মতো ছিল। জানি না কী করবো আসলে।

এখন বিশ্বকাপের মৌসুম। এটাই শেষবার, আমার প্রথম প্রেম মেসি রোনালদোর দ্বৈরথের শেষ মঞ্চ। মনে পড়ে যায়—২২ এর বিশ্বকাপ, যেখানে মেসি অবশেষে তার স্বপ্ন পূরণ করেছিল, আর পুরো পৃথিবী একসঙ্গে সেই মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছিল। হয়তো এবার আরেকটা গল্প লেখা হবে, অথবা হয়তো শুধু বিদায়ের প্রস্তুতি চলবে। দিন যত ঘনিয়ে আসছে, তত উত্তেজনা আর খারাপ লাগা একসঙ্গে কাজ করছে। বুকের ভেতর চাপা এক শূন্যতা, আবার একইসঙ্গে শেষবারের মতো সবটুকু উপভোগ করে নেওয়ার তাড়া।

কারণ আমরা জানি, এটা শুধু দুইজন খেলোয়াড়ের গল্প না, এটা একটা সময়ের গল্প। এটা শুধু গোল আর ট্রফির গল্প না, এটা আবেগের গল্প। আর সেই গল্পটা শেষ হওয়ার আগে আমরা শেষবারের মতো একটু ধীরে, একটু গভীরভাবে সেটাকে অনুভব করতে চাই। এবারই তো শেষ?

ছোটবেলা থেকেই আমি মেসির ভক্ত, বিশ্বাস করুন, যতবার মেসি বলটা নিজের দখলে নেয়, ততবারই চোখ দুটো জ্বলে ওঠে, এই দৃশ্যগুলো হারিয়ে যাবে—এটা মানতেই আমার কতদিন লাগবে আমি জানি না, ঘরের দেয়ালে মেসির শেষ পরা জার্সিটার একটা রেপ্লিকা ফ্রেমবন্দি করে রাখবো। চলুন, উপভোগ করি গ্রেটেস্ট অব অল টাইম মেসি-রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ।

লেখক: ক্রীড়া শিক্ষক, স্কলাসটিকা, ঢাকা