ছবি: এআই/বন্ধুসভা
দেশে থাকতে মায়ের বারবার ডাক শুনে কতবার যে বিরক্ত হয়েছি, তার হিসাব নেই। অথচ আজ এই দূর প্রবাসে, অ্যালার্মের কর্কশ শব্দে যখন ঘুম ভাঙে, তখন সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে মায়ের সেই মায়াভরা ডাক: ‘বাবা, ওঠ, সকাল হয়ে গেছে।’
ক্লান্তি যখন গ্রাস করে, চারপাশটা বড্ড অচেনা আর যান্ত্রিক লাগে, তখন চোখ বন্ধ করলেই মায়ের সেই চিরচেনা আঁচলের সুবাস পাই। মায়ের একচিমটি হাসির কাছে পৃথিবীর সবকিছুই যেন ফিকে।
একসময় খাবার নিয়ে কত রাগ করতাম। কোনো কিছু হলেই খাবারের ওপর রাগ দেখাতাম। মা এসে রাগ ভাঙাত, খাবার নিয়ে আসত। মায়াভরা কণ্ঠে বোঝাত, ‘খেয়ে ফেল বাবা, খাবারের ওপর রাগ করতে নেই।’
আর আজ দূর প্রবাসে নিজের খাবার নিজেকেই গুছিয়ে নিতে হয়। বারবার মনে পড়ে, কী অদ্ভুতভাবে মা আমার মুখ দেখেই বুঝে যেতেন আমি ক্ষুধার্ত, নাকি মন খারাপ করে বসে আছি।
প্রবাসের এই ব্যস্ত জীবনে মানুষের এত ভিড়ের মধ্যেও একাকিত্বটা যেন আরও বেশি অনুভূত হয়। সেই মুহূর্তগুলোয় মনে হয়, মায়ের হাতের এক লোকমা ভাত, তাঁর স্নেহভরা কণ্ঠে: ‘খেয়ে নে বাবা;’ স্কুল থেকে বাসায় এসে যখন মাকে দেখতাম না, তখন ‘মা, মা’ বলে চিল্লাতে চিল্লাতে পুরো বাড়ি এক করে দিতাম। মা যখন মাংস রান্না করত, বাটি হাতে নিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম; তখন এক-দুই টুকরা দিত, কী যে আনন্দ লাগত। যখন খেতে বসতাম, আমার তরকারি বেশি লাগত। ভাইবোন একসঙ্গে খেতে বসতাম। আমার ভাগেরটা নিয়েও মায়ের কাছ থেকে বারবার তরকারি চাইতাম। মা মাঝেমধ্যে বিরক্ত হয়ে বলত: ‘তক্কারি, তক্কারি আর নাই;’ আমার ভাইবোনেরা হাসত, আর আমাকে ভেঙাত। এসব ছোট স্মৃতিই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় সুখ।
আজ মা হাজার মাইল দূরে, কিন্তু তাঁর দোয়া আমার সঙ্গেই থাকে। মায়ের দোয়াই সবচেয়ে বড় শক্তি। এই কঠিন প্রবাসজীবনে যতবার হোঁচট খাই, ততবার মনে হয় মায়ের ভালোবাসা আর দোয়াই আমাকে আগলে রেখেছে। প্রবাসে এসে বুঝেছি, পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তির জায়গা কোনো শহর নয়, কোনো দেশ নয়, মায়ের কোলই ছিল আসল ঠিকানা।
আরও পড়ুন
নতুন কাপড়ের গন্ধে ফিরে আসে মা
১২ জুন ২০২৬
ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টায়, বছর পার হয়, প্রবাসের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজেকে সফল প্রমাণ করার এই অন্ধ দৌড়ে আমরা হয়তো অনেক কিছুই পাই, কিন্তু হারিয়ে ফেলি জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলো। দূর থেকে যখন মায়ের মাথায় আরও দুটো সাদা চুল গজিয়ে ওঠার খবর পাই, কিংবা মায়ের গলার আওয়াজে বার্ধক্যের ছাপটা স্পষ্ট টের পাই, তখন কলিজাটা মোচড় দিয়ে ওঠে।
টাকা হয়তো অনেক কামানো যাবে মা, কিন্তু তোমার সঙ্গে কাটানো একেকটা বিকেল তো আর কোনো দিন ফিরে পাব না। দূরত্বের এই দেয়াল বড্ড নিষ্ঠুর! শুধু দূর থেকেই আল্লাহর কাছে হাত পেতে বলি: ‘আমার আয়ু থেকে কেটে হলেও আমার মাকে তুমি সুস্থ আর হাসিখুশি রেখো।’
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা
ফিচার থেকে আরও পড়ুন
জীবনযাপন
প্রবাসী জীবন
মা



