কেভিন ডি ব্রুইনা: বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ স্বপ্নের শেষ মহারথী
কেভিন ডি ব্রুইনা: বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ স্বপ্নের শেষ মহারথী

ফুটবলে সব নায়কের নাম গোলের পাশে লেখা থাকে না। কেউ গোল করেন, কেউ গোল বানান, কেউ একজন পুরো ম্যাচের ছন্দই বদলে দেন। কেভিন ডি ব্রুইনা একজন শিল্পী, যার তুলির আঁচড়ে ফুটে ওঠে আক্রমণের সৌন্দর্য, পায়ের নিখুঁত পাসে জন্ম নেয় অসংখ্য গোলের গল্প।

বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে বেলজিয়ামের ভরসা

স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে কোটি কোটি বেলজিয়ান সমর্থকের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম এখনও ডি ব্রুইনা। বয়স ৩৫-এর দিকে। তার খেলার বুদ্ধিমত্তা, দূরদৃষ্টি, নিখুঁত পাস এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করার অসাধারণ ক্ষমতা এখনও বিশ্বের সেরাদের কাতারে। বড় ম্যাচে একটি মুহূর্তই যথেষ্ট। সেই মুহূর্ত সৃষ্টি করার ক্ষমতা এখনও আছে এই মহাতারকার।

শৈশব ও ক্যারিয়ারের শুরু

১৯৯১ সালের ২৮ জুন বেলজিয়ামের ড্রঙ্গেনে জন্ম নেওয়া ডি ব্রুইনার শৈশব ছিল সংগ্রাম আর স্বপ্নে ভরা। ছোটবেলায় পরিবার ছেড়ে ফুটবল একাডেমিতে থাকতে হয়েছে। প্রিয়জনদের কাছ থেকে দূরে থাকার কষ্ট তাকে মানসিকভাবে আরও শক্ত করেছে। বাবা-মায়ের অক্লান্ত সমর্থন আর নিজের কঠোর পরিশ্রমই তাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্লাব ক্যারিয়ারের উত্থান

ফুটবলের হাতেখড়ি স্থানীয় ক্লাবে। এরপর বেলজিয়ামের জেঙ্কে নিজের প্রতিভার ঝলক দেখান। ইংল্যান্ডের চেলসিতে গিয়ে খুব বেশি সুযোগ পাননি। মনে হয়েছিল হয়ত এখানেই থেমে যাবে তার স্বপ্ন। ডি ব্রুইনা হাল ছাড়েননি। জার্মানির উলফসবার্গে গিয়ে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলেন। ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দিয়ে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা মাঝমাঠের খেলোয়াড়ে পরিণত হন। একের পর এক প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা, ইউরোপসেরা ক্লাব প্রতিযোগিতার শিরোপা, অসংখ্য গোল তৈরির পাস এবং ব্যক্তিগত পুরস্কার তাকে পৌঁছে দিয়েছে কিংবদন্তিদের কাতারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ডি ব্রুইনার অসাধারণ দৃষ্টি ও খেলা নির্মাণ

ডি ব্রুইনার সবচেয়ে বড় শক্তি অসাধারণ দৃষ্টি। অন্যরা যেখানে শুধু খেলোয়াড় দেখে, তিনি সেখানে দেখতে পান ফাঁকা জায়গা। অন্যরা যেখানে নিরাপদ পাস দেয়, তিনি সেখানে ঝুঁকি নিয়ে তৈরি করেন গোলের সুযোগ। তার একটি ফাঁক গলে বাড়ানো বল কিংবা নিখুঁত ক্রস মুহূর্তেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে এলোমেলো করে দিতে পারে। বিশ্ব ফুটবলে তাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলা নির্মাতাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের শেষ মহারথী

বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের অনেকেই বিদায় নিয়েছেন কিংবা ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে। ডি ব্রুইনা এখনও আছেন, তিনিই দলের হৃদস্পন্দন। মাঠে তিনি শুধু অধিনায়ক নন, তিনি দলের ছন্দ নির্মাতা, অনুপ্রেরণা এবং সংকটের মুহূর্তে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মানুষ।

স্পেনের বিপক্ষে কৌশলগত ভূমিকা

চলতি বিশ্বকাপে তার কাঁধেই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। স্পেনের মতো বল দখলে পারদর্শী দলের বিপক্ষে বেলজিয়ামের জয়ের চাবিকাঠি হতে পারেন ডি ব্রুইনা। মাঝমাঠে তার সৃজনশীলতা, দূরপাল্লার পাস, নিখুঁত কর্নার, ফ্রি-কিক এবং দূর থেকে নেওয়া শটই হতে পারে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণের অস্ত্র।

তিনি একা নন। জেরেমি ডকুর দুরন্ত গতি, রোমেলু লুকাকুর অভিজ্ঞতা ও গোল করার ক্ষমতা এবং লোইস ওপেন্দার দ্রুতগতির পালটা আক্রমণ, তিন শক্তিকে এক সুতোয় গাঁথার কাজটিও করবেন ডি ব্রুইনা। তিনি ভালো খেললে বেলজিয়াম ভালো খেলে এটাই গত এক দশকের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

ডি ব্রুইনার বক্তব্য

নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে ডি ব্রুইনা বলেছেন, ‘জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানো সব সময়ই বিশেষ অনুভূতি। বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচই একটি ফাইনালের মতো। আমরা জানি সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ, এই দলের সামর্থ্যের ওপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে। আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করব।’

কোচের আস্থা

তার প্রতি আস্থার কথা জানিয়ে বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া বলেছেন, ‘কেভিন এমন একজন ফুটবলার, যে একটি মুহূর্তেই ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারে। তার অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আমাদের জন্য অমূল্য। বড় ম্যাচে এমন খেলোয়াড়ই পার্থক্য গড়ে দেয়।’

সময়ের শেষ অধ্যায়েও প্রভাব

সময় হয়ত ধীরে ধীরে ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে কেভিন ডি ব্রুইনাকে। কিংবদন্তিরা কখনও শুধু গতিতে বাঁচেন না, তারা বাঁচেন মেধায়, দূরদৃষ্টিতে আর প্রজ্ঞায়। স্পেনের বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনালে বেলজিয়ামের স্বপ্ন আবারও ভর করবে সেই জাদুকরী ডান পায়ের ওপর।

একটি পাস, হয়ত একটি কর্নার, হয়ত একটি দূরপাল্লার শট, তাতেই বদলে যেতে পারে ম্যাচের ইতিহাস। কেভিন ডি ব্রুইনা এখনও সেই ফুটবলার, যিনি এক মুহূর্তেই কোটি মানুষের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন।