১৯৯০ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি। ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপে কিছু দল ট্রফি জেতে, কিছু দল সময়কে নিজের পক্ষে সাক্ষী হিসেবে তৈরি করে। জার্মান ফুটবল দল দ্বিতীয়টির অন্তর্ভুক্ত। ১৯৯০ থেকে ২০১৪—এই ২৪ বছরকে যদি একটি গল্পে রূপ দেওয়া যায়, তবে সেটি হবে জার্মান রূপকথার জয়-পরাজয়ের আখ্যান। যে আখ্যানে রূপকথার সেনারা কখনো পরাজয়ে ভেঙে পড়েনি, বরং প্রতিটি পতনকে পরবর্তী বিজয়ের প্রস্তুতি হিসেবে নিয়েছে। নিজেদের ধার ও ভারকে সঙ্গে করে জয় করেছে সব অজেয়কে।
১৯৯০: ইতালির মাটিতে প্রথম জয়
১৯৯০ সালে ইতালির দুর্গে ফুটবলের মহারণে বিশ্বকাপ জিতে নেয় জার্মানি। এ জয় যেন প্রাচীন সাম্রাজ্যের শেষ কোনো যুদ্ধ জয়। সেই দল শুধু চ্যাম্পিয়ন হয়নি, তারা প্রমাণ করেছিল, সংগঠিত ফুটবল শক্তি কখনো নান্দনিকতার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং আধুনিক ফুটবলশৈলীর আরেক রূপ। এটিকে জার্মানির চূড়ান্ত বিজয় ভেবে কেউ কেউ ভুল করেছিলেন। ফুটবল বিধাতা জার্মানির এ বিজয় কাব্যকে পরবর্তী সময়ে মহাকাব্যে রূপ দিয়েছেন।
আধুনিক জার্মান ফুটবলের পুনর্জন্ম
আধুনিক জার্মান পাওয়ার ফুটবলের গল্পে সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায় শুরু হয় এরপর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপ বদলেছে, ফুটবল বদলেছে, ফুটবল প্রতিভার কেন্দ্র বদলেছে। একসময় সমালোচকেরা বলতে শুরু করল—‘জার্মানি আর আগের মতো নেই’, ‘নতুন প্রতিভা নেই, ধার নেই, পাওয়ার ফুটবল ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে’। কিন্তু জবাব দিতে বেশি সময় নেয়নি দলটি। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে বাদ পড়লেও ১৯৯৬ সালেই চেক প্রজাতন্ত্রকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইউরোপের মুকুট জিতে নেয় জার্মানি। প্রত্যাবর্তনের এই ইঙ্গিত পূর্ণতা পায় ২০০২ সালের বিশ্বকাপ মঞ্চে।
২০০২ বিশ্বকাপ: অলিভার কান ও মাইকেল বালাকের নায়কোচিত অভিযান
জার্মানির জন্য এ বিশ্বকাপ ছিল কঠিন পরীক্ষার, যেন আহত সৈনিকদের এক অসম্ভব অগ্রযাত্রা। কেননা বিশ্বকাপ মঞ্চায়িত হওয়ার আগে খুব কম ফুটবল বোদ্ধা জার্মানিকে ফাইনালের হিসেবে রেখেছিল। কিন্তু জার্মানি সেই দল যারা যুগে যুগে রূপকথার জন্ম দিয়েছে।
অলিভার কান ২০০২ বিশ্বকাপ অভিযাত্রার প্রধান নায়ক ছিলেন। গোলপোস্টের নিচে তিনি শুধু গোলরক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন দুর্ভেদ্য এক দুর্গ। পুরো টুর্নামেন্টে ফাইনালের আগে ৬ ম্যাচে মাত্র ১ গোল হজম করেছিল দলটি। শেষ পর্যন্ত তিনি ৭ ম্যাচে মাত্র ৩ গোল হজম করে এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসে আজও একমাত্র গোলরক্ষক হিসেবে গোল্ডেন বল জেতেন; অর্থাৎ টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন অলিভার কান। তাঁর বিশ্বস্ত হাত যেন প্রতিপক্ষের স্বপ্ন আটকে রাখত। যখন রক্ষণ ভেঙে পড়েছে, কান দাঁড়িয়ে থেকেছেন শেষ অতন্দ্রপ্রহরীর মতো।
সেবার ফুটবল বিশ্ব মাঝ মাঠে নতুন এক মহানায়ককে আবিষ্কার করে; সর্বকালের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার মাইকেল বালাক। সংখ্যা দিয়ে তাঁর অবদান মাপা যায় না, তবু সংখ্যাগুলো বিস্ময়কর। তিনি ৬ ম্যাচে খেলেন, করেন ৩ গোল, দেন ৪ অ্যাসিস্ট; গড়ে প্রতি ম্যাচে প্রায় ৩.৭টি শট নেন এবং পুরো দলের আক্রমণের হৃৎস্পন্দন হয়ে ওঠেন। সেমিফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে তাঁর গোল জার্মানিকে ফাইনালে তোলে। অথচ সেই ম্যাচেই পাওয়া হলুদ কার্ডের কারণে তিনি ফাইনাল খেলতে পারেননি। সম্ভবত বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অনুপস্থিতিগুলোর একটি ছিল ২০০২ সালে মাইকেল বালাকের বিশ্বকাপ ফাইনাল না খেলা।
ফাইনালে জার্মান দলের হয়ে বালাকের শূন্যতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তাঁর ফুটবলীয় মনোভাব এবং আগ্রাসন সম্পর্কে ধারণা পেতে সাহায্য করবে তাঁর এই উক্তিটি—‘বৈধতার সর্বোচ্চ সীমায় যেতে হলে আমাদের খুবই অ্যাগ্রেসিভ হতে হবে।’
বালাকের পায়ে বল থাকার মানেই ছিল জার্মানরা নিরাপদ। দারুণ সব গোলের সম্ভাবনা তৈরি করতে; কখনো চিকি পাস, কখনো দুর্দান্ত লং পাস, কিংবা কখনো নিজেই নিয়ে নিতেন আচমকা দূরপাল্লার জোরালো শট। কিন্তু কখন কী করবেন, এটা ছিল প্রতিপক্ষের কাছে সব সময়ই ধাঁধার মতো!
মিরোস্লাভ ক্লোসা: আকাশের যোদ্ধা
মিরোস্লাভ ক্লোসার গল্পটা আরও দীর্ঘ ও মহাকাব্যিক। মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি করেন ৫ গোল। অবিশ্বাস্যভাবে পাঁচটিই হেড থেকে। পাতালে ক্ষিপ্রগতিতে দৌড়ানো, তিনি ছিলেন আকাশের যোদ্ধা, যিনি প্রতিবার ক্রস উঠলেই মনে হতো মাধ্যাকর্ষণকে অস্বীকার করছেন। ইতিহাস যাকে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা বানাবে। তাঁর সূচনা হয়েছিল ২০০২ বিশ্বকাপে। ৪ বিশ্বকাপে মোট ১৬ গোলের মালিক সর্বকালের অন্যতম সেরা এই স্ট্রাইকার। সেবারের ৫টি, ২০০৬–এর বিশ্বকাপে ৫টি, ২০১০–এ ৪টি এবং ২০১৪ সালে ২টি গোল করেন মিরোস্লাভ ক্লোসা।
২০০২-এর ফাইনালে হার: প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি
জার্মানি শেষ পর্যন্ত ২০০২–এর ফাইনালে হারে। কিন্তু সেটি কোনো অধ্যায়ের উপসংহার ছিল না। সেটি ছিল প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি। পরের বিশ্বকাপে নিজেদের মাঠে দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেমিতে হারে জার্মানি। ২০০৬ এবং ২০১০ টানা দুই বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অধিকার করে শেষ করতে হয়েছে দলটিকে। তবে মাঠের দাপট কোনো অংশে কম ছিল না জার্মানির। ২০০৬–এ ক্লোসা ও বালাকের সঙ্গে পোডলস্কি, ফিলিপ লাম, শোয়েনস্টাইগার আলো ছড়িয়েছেন মাঠে। আর ২০১০–এ এদের পাশাপাশি ম্যানুয়েল নায়ার, মেসুত ওজিলের পাশাপাশি দ্যুতি ছড়িয়েছেন গোল্ডেন বুট এবং সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের খেতাব পাওয়া থমাস মুলার।
২০১৪: ব্রাজিলের মাটিতে চতুর্থ তারকা
২০০২–এর বিশ্বকাপে রানার্সআপ, পরের দুই বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান—টানা তিন বিশ্বকাপে খুব কাছে এসেও ট্রফি স্পর্শ করতে না পারার আক্ষেপ ছিল জার্মানির। সে আক্ষেপ বারুদ হয়ে জ্বলে ওঠে ২০১৪ সালে ব্রাজিলের মাটিতে। ব্রাজিলের আকাশে জার্মানি শুধু বিশ্বকাপ জেতেনি; তারা দেখিয়েছে ইতিহাস কখনো হঠাৎ তৈরি হয় না। ইতিহাস তৈরি হয় ধৈর্য, পুনর্গঠন, বিশ্বাস আর বারবার ফিরে আসার সাহসে। তাই ২০১৪–তে জার্মানির গল্প শুধু ট্রফির গল্প নয়; এটি এমন এক রাজবংশের গল্প, যারা কখনো ঘোষণা করে না যে তারা ফিরছে। তারা শুধু ফিরে আসে।
ব্রাজিলের আকাশে ২০১৪ সালের সেই গ্রীষ্ম ছিল শুধু একটি বিশ্বকাপ নয়, এটি ছিল বহু বছরের অপেক্ষার শেষ অধ্যায়। ২৪ বছরের দীর্ঘ যাত্রা শেষে জার্মানি এসেছিল বিজয় ছিনিয়ে নিতে নয়, নিজের ভাগ্য পুনর্লিখন করতে। এ দল আর পুরোনো জার্মানি ছিল না; তারা ছিল কোচ জোয়াকিম লোর নিজ হাতে গড়া শিল্প ও শৃঙ্খলার মিলিত রূপ। নয়্যারের হাতে ছিল দুর্গের দরজা, ক্রুসের পায়ে সময়ের নিয়ন্ত্রণ। মুলার আক্রমণভাগকে রণক্ষেত্রে পরিণত করতেন, লামের নীরব নেতৃত্ব দলকে এক রেখায় বেঁধে রাখত। আর সামনে ছিল ইতিহাসের শিকারি মিরোস্লাভ ক্লোসা।
সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল ফুটবলের রাজ্য ব্রাজিল, ফুটবল মহারণও ছিল সে ব্রাজিলের মাটিতেই। কিন্তু জার্মানি সেদিন যুদ্ধ করেনি, তারা যেন এক নিখুঁত সিম্ফনি বাজিয়েছিল। গোলের পর গোল, আক্রমণের পর আক্রমণ, আর স্কোরবোর্ড থেমে গেল ৭-১–এ। এটি শুধু জয় ছিল না; এটি ছিল বিশ্ব ফুটবলে আধিপত্য বিস্তারের ঘোষণা।
তবে মহাকাব্যের শ্রেষ্ঠ দৃশ্যটি তখনো বাকি ছিল। ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সময় ফুরিয়ে আসছিল, পৃথিবী অপেক্ষা করছিল নিয়তির সিদ্ধান্তের। অতিরিক্ত সময়ের সেই মুহূর্তে আকাশ থেকে নামা এক বল, বুকের নিয়ন্ত্রণ, আর মারিও গোটসের পায়ের ছোঁয়া; মনে হয়েছিল যেন ইতিহাস নিজেই গোলপোস্টে প্রবেশ করল। শেষ বাঁশি বাজল। জার্মান খেলোয়াড়রা উদ্যাপন করছিল, কিন্তু সেটি কোনো রাতের আনন্দ ছিল না। সেটি ছিল আট বছরের এক দর্শনের পূর্ণতা, চব্বিশ বছরের এক প্রতীক্ষার অবসান। আর ব্রাজিলের আকাশে যখন চতুর্থ তারকা জ্বলে উঠল, তখন পৃথিবী বুঝেছিল কিছু বিজয় শুধু ট্রফি জেতে না, বরং নিজেদের পক্ষে যুগ তৈরি করে।
পরবর্তী সময়: অগ্নিপরীক্ষা ও পুনরুত্থানের সম্ভাবনা
২০১৪ সালের চ্যাম্পিয়ন জার্মানির পরের সময়টুকু অগ্নিপরীক্ষার। যে পরীক্ষায় এখনো সুবিচার করতে পারেনি দলটি। ২০১৭ সালে কনফেডারেশন কাপ জেতা ছাড়া এ দলটির আর উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য নেই। সমালোচকদের কণ্ঠ আরও চড়া করে ২০১৮ এবং ২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের হালখাতা। তবে এবার পরাজিত জার্মানিই যেন অনেক বেশি প্রতিশ্রুতিশীল ও আগ্রাসী। সে জন্যই হয়তো ইংল্যান্ড কিংবদন্তি ববি চার্লটন একটা কথা বলেছিলেন, ‘আমরা যখনই ভাবি জার্মানরা হেরে গেছে, তখনই কোনো না কোনোভাবে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে।’
এ উক্তিটির প্রমাণ সারা পৃথিবী পেয়েছে ১৯৯০, ২০০২ এবং ২০১৪–তে। এবার বোধ হয় সেই মাহেন্দ্রক্ষণের পুনর্মঞ্চায়ন হবে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’–এ। জামাল মুসিয়ালা-ফ্লোরিয়ান ভির্টৎসের যুগলবন্দীতে ফুটবল বিশ্ব আবারও দেখবে বালাক এবং ক্লোসার অবয়বকে। এটাই বিশ্বাস জার্মান সমর্থকদের। নাগেলসম্যানের আধুনিক ও নমনীয় কৌশলের ওপর ভর করে অভিজ্ঞ ও তরুণের অপূর্ব মিশ্রণ এবারের জার্মান ফুটবল টিমে। গ্রুপ পর্বের বাধা সহজে ফেরিয়ে রাউন্ড অব ১৬–তে ফ্রান্সের সামনে টুর্নামেন্টের বড় পরীক্ষায় অবতীর্ণ হবে জার্মানি। এ পরীক্ষায় জিততে পারলে এবারের বিশ্বকাপে ফাইনালে ওঠার রাস্তা খুব কঠিন হবে না দলটির জন্য। আর যদি জার্মানিকে রাউন্ড অব ১৬-এ ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে এরপর ইংল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডসকে কোয়ার্টারে এবং সেমিফাইনালে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা। তবে যেকোনো রাউন্ডে প্রতিপক্ষ যে-ই হোক না কেন, নিজেদের দিনে জার্মানির জয়রথ থামানোর শক্তি কারও নেই। কারণ, ফুটবল বিশ্বে প্রত্যাবর্তনের মহাকাব্যিক রূপকথার একমাত্র লেখক দলটি।



