বিশ্বকাপে প্রথম দুই ম্যাচেই বদলি নেমে গোল করেছেন ডেনিস উনদাভ। ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে কারখানায় যেতে হতো, টানা আট ঘণ্টা লেজার মেশিন চালিয়ে ছুটতেন অনুশীলনে। বাড়িতে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা। এই ছিল ডেনিজ উনদাভের ১৭ বছর বয়সের একেকটি দিনের গল্প। সেই ছেলেটিই আজ ১২ বছর পর বিশ্বকাপে জার্মানির নকআউটে ওঠার নায়ক।
নকআউটে ওঠার নায়ক
জার্মানি চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। সব আসরেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার। কিন্তু জার্মানির এবারের নকআউটে ওঠা ছোটখাটো ঘটনা নয়। ২০১৪ বিশ্বকাপে ট্রফি জেতার পর ইউরোপিয়ান দলটি আর নকআউটে উঠতে পারেনি। সর্বশেষ দুই আসরেই বিদায় নিতে হয়েছে গ্রুপ পর্ব থেকে। এবার জার্মানরা সেই বাধাই টপকাল উনদাভের হাত ধরে। তা–ও কীভাবে?
শনিবার রাতে টরন্টোর বিএমও ফিল্ডে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জার্মানি যখন ১-০ গোলে পিছিয়ে, ঠিক সেই মুহূর্তে মাঠে নামলেন উনদাভ। এরপরের গল্পটা স্বপ্নের মতো। ৬৮তম মিনিটে নাদিম আমিরির ক্রস থেকে বাঁ পায়ের ভলিতে সমতা, তারপর যোগ করা সময়ে বক্সের কিনারে বল পেয়ে শক্তিশালী শটে জাল কাঁপিয়ে ২-১। উনদাভের জোড়া গোলে জার্মানি উঠে গেল বিশ্বকাপ নকআউটে।
বদলি হিসেবে রেকর্ড
উনদাভ অবশ্য জার্মানির প্রথম ম্যাচে কুরাসাওয়ের বিপক্ষেও গোল করেছিলেন। সেটিও বদলি নেমেই। সব মিলিয়ে দুই ম্যাচে বেঞ্চ থেকে নেমে তিন গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট। ১৯৬৬ সালের পর এক আসরে বদলি খেলোয়াড়দের মধ্যে যা যৌথভাবে সর্বোচ্চ। ১৯৯০ আসরে রজার মিলা আর ২০২৬ আসরে উনদাভ—তালিকাটা এটুকুই।
কারখানার শ্রমিক থেকে ফুটবল তারকা
অথচ কয়েক বছর আগেও এই উনদাভের পরিচয় ছিল অন্য রকম। সপ্তাহে ১২০ পাউন্ড মজুরিতে কাজ করতেন একটি কারখানায়। কুর্দি-ইয়াজিদি পরিবারে জন্ম ডেনিজ উনদাভের। তাঁর বেড়ে ওঠা জার্মানির ছোট শহর আখিমে। কুর্দি-ইয়াজিদি পরিবারে জন্ম নেওয়া উনদাভের মা–বাবা তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্ত অঞ্চল থেকে জার্মানিতে অভিবাসী হয়ে এসেছিলেন। পাঁচ ভাই–বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট উনদাভের ফুটবল-প্রেম শৈশব থেকেই। স্থানীয় ক্লাব টিএসভি আখিমে খেলতে খেলতে ২০০৭ সালে ভেরডার ব্রেমেনের একাডেমিতে সুযোগ পান। তবে ২০১২ সালে ব্রেমেন তাঁকে দল থেকে বাদ দেন। কারণ, উনদাভের উচ্চতা কম।
ওই বয়সে ব্যাপারটা হজম করা কষ্টকর ছিল তাঁর জন্য। পরবর্তী সময়ে বেলজিয়ান সংবাদমাধ্যম সেভেন সুর সেভেনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উনদাভ বলেছিলেন, ‘ভেরডার (ব্রেমেন) যখন বলল, তাদের ওখানে আমার ভবিষ্যৎ নেই, খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু আমি আশা ছাড়িনি।’
নিচের স্তরের ফুটবলে সংগ্রাম
উনদাভ আশা ছাড়েননি সত্যি, কিন্তু পথ ছিল বন্ধুর। ১৭ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে জার্মানির চতুর্থ বিভাগের ক্লাব টিএসভি হাভেলসায় যোগ দেন উনদাভ। নিচের স্তরের ক্লাব, ফুটবল থেকে আসা সামান্য পারিশ্রমিকে জীবন চলে না। তাই কারখানায় কাজ নেন উনদাভ, ‘দিনে আট ঘণ্টা লেজার মেশিন চালানোর কাজ করতাম। ঘুম থেকে উঠতাম ভোর ৪টার দিকে, কারখানায় যেতাম, তারপর অনুশীলনে। রাত ৮টার দিকে বাড়িতে ফিরতাম...পরের দিন আবার একইভাবে সব শুরু হতো।’
এরপর কয়েক বছর কেটে যায় জার্মানির নিচের স্তরের ফুটবলে। হাভেলসা, ব্রাউনশোয়াইগরন দ্বিতীয় দল, তারপর মেপেন। শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবল তখনো অনেক দূরের স্বপ্ন।
বেলজিয়ামে মোড় ঘোরানো
২০২০ সালে আসে মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। বেলজিয়ামের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব ইউনিয়ন সেন্ট-জিলোয়ায় যোগ দিলেন উনদাভ। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ। উনদাভও যেন নিজেকে আবিষ্কার করলেন নতুন রূপে। প্রথম মৌসুমেই ২৯ ম্যাচে ১৮ গোল, ইউনিয়ন এসজি উঠে গেল বেলজিয়ামের শীর্ষ লিগে। পরের বছর বেলজিয়ান প্রো লিগে করলেন ৩৯ ম্যাচে ২৬ গোল, জিতে নিলেন লিগের সেরা গোলদাতা আর সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। এরপর আর পেছনে তাকানোর কথা নয়। ব্রাইটন হয়ে স্টুটগার্টে এসে উনদাভ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন বুন্দেসলিগার অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড হিসেবে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে করলেন ১৯ গোল, বুন্দেসলিগায় হ্যারি কেইনের পর দ্বিতীয়, জার্মানদের মধ্যে সর্বোচ্চ!
জাতীয় দলে দ্বন্দ্ব ও পুনরুদ্ধার
তবে উনদাভের জাতীয় দলের যাত্রাপথটা তেমন মসৃণ ছিল না। বিশেষ করে বিশ্বকাপের আগে। গত মার্চে ঘানার বিপক্ষে বদলি নেমে জয়সূচক গোল করেছিলেন উনদাভ, এরপর প্রথম একাদশে খেলার ইচ্ছার কথা জানিয়ে ফেঁসে যান। কোচ ইউলিয়ান নাগেলসমান এমনও বলেছিলেন, শুরু থেকে মাঠে থাকলে হয়তো গোলটাই হতো না। পরে অবশ্য নাগেলসমান এ নিয়ে দুঃখপ্রকাশও করেন। তবে দ্বন্দ্বের কারণে উনদাভ বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাবেন কি না, প্রশ্ন ছিল।
উনদাভ দলে জায়গা পেয়েছেন এবং কুরাসাওয়ের বিপক্ষে বদলি নেমে এক গোলের সঙ্গে দুই অ্যাসিস্ট, আইভরিকোস্টের বিপক্ষে জোড়া গোলে দলকে শেষ ৩২–এর টিকিটও এনে দিয়েছেন। ম্যাচের পর এক সাংবাদিক জার্মানি কোচকে জিজ্ঞাসা করেন, ইকুয়েডরের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে কি উনদাভ প্রথম একাদশে থাকতে পারেন? নাগেলসমানের জবাব, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’ কয়েক মাস আগে দ্বিধায় থাকা কোচ এখন বলছেন, ‘কেন আমি তার গতি নষ্ট করব? সে প্রথম একাদশেও থাকতে পারে।’
জন্মদিনে বিশ্বকাপ ফাইনাল?
২৯ বছর বয়সী উনদাভের জন্মদিন ১৯ জুলাই। কাকতালীয়ভাবে সেদিনই বিশ্বকাপ ফাইনাল। ১৪ বছর বয়সে যাঁকে বলা হয়েছিল, তাঁর উচ্চতা যথেষ্ট নয়, ১৭ বছর বয়সে যে ছেলেটি ভোর চারটায় উঠে কারখানায় যেতেন—তিনি কি জন্মদিনে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখতে পারেন? উনদাভের গল্প বলছে, পারেন।



