বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে ব্রাজিলের বিপক্ষে আরলিং হালান্ড নিজের ক্যারিয়ারের আরেকটি অমর অধ্যায় লিখেছেন। ম্যাচের ৭৯ মিনিটে বজ্রগতির আক্রমণ শেষ করে নরওয়েকে এগিয়ে দেন তিনি। যোগ করা সময়ে আবারও হালান্ডের শো—নিখুঁত ফিনিশিংয়ে জোড়া গোল করে নিশ্চিত করেন নরওয়ের ২-১ ব্যবধানের ঐতিহাসিক জয়। শেষ মুহূর্তে নেইমারের পেনাল্টি গোল শুধু ব্যবধান কমায়, ব্রাজিলকে বাঁচাতে পারেনি। বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা, আর ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে নরওয়ে।
হালান্ডের জন্ম ও শৈশব
২০০০ সালের ২১ জুলাই ইংল্যান্ডের লিডসে জন্ম হালান্ডের। তার বাবা আলফ-ইঙ্গে হালান্ড খেলতেন লিডস ইউনাইটেডে। জন্ম ইংল্যান্ডে হলেও তিন বছর বয়সে পরিবার ফিরে যায় নরওয়ের ছোট্ট শহর ব্রিনেতে, সেখানেই বেড়ে ওঠা। ছোটবেলায় ফুটবলের পাশাপাশি হ্যান্ডবল, গলফ ও অ্যাথলেটিক্সেও সমান আগ্রহ ছিল। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে স্ট্যান্ডিং লং জাম্পে বয়সভিত্তিক বিশ্বসেরা দূরত্ব লাফানোর গল্প এখনও নরওয়েতে কিংবদন্তির মতো শোনা যায়। সেই বিস্ফোরণধর্মী শক্তির প্রতিফলনই আজ দেখা যায় তার দৌড়, লাফ আর হেডে।
পেশাদার ফুটবলে পথচলা
স্থানীয় ক্লাব ব্রিনে এফকের একাডেমিতে ফুটবলের হাতেখড়ি। ২০১৬ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে পেশাদার অভিষেক। প্রথমে উইঙ্গার হিসেবে খেললেও পরে কোচ তাকে সেন্টার ফরোয়ার্ডে নিয়ে আসেন। সেখান থেকেই শুরু গোলের অমিত ক্ষুধা। ২০১৭ সালে যোগ দেন মোলদেতে, যেখানে কিংবদন্তি ওলে গুনার সুলশায়ারের অধীনে নিজেকে আরও পরিণত করেন। ২০১৮ সালে এক ম্যাচে প্রথম ২১ মিনিটেই চার গোল করে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজরে চলে আসেন।
ক্লাব ক্যারিয়ারে উত্থান
২০১৯ সালে অস্ট্রিয়ার রেড বুল সালজবুর্গে গিয়ে নৈপুণ্যের ঝিলিক দেখান। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ অভিষেকেই হ্যাটট্রিক, প্রথম পাঁচ ম্যাচেই গোল করে গড়েন নতুন ইতিহাস। এরপর বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে যোগ দিয়ে ৮৯ ম্যাচে ৮৬ গোল করেন। ২০২২ সালে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়ার পর গোলের নতুন অভিধান লিখতে শুরু করেন। অভিষেক মৌসুমেই প্রিমিয়ার লিগে রেকর্ড ৩৬ গোল এবং সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫২ গোল করে ভেঙে দেন বহু বছরের রেকর্ড। সেবার সিটি জেতে প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ—ঐতিহাসিক ট্রেবল। একই মৌসুমে জেতেন প্রিমিয়ার লিগ গোল্ডেন বুট, ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু, প্রিমিয়ার লিগ প্লেয়ার অব দ্য সিজন, ইয়াং প্লেয়ার অব দ্য সিজন এবং উয়েফা বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার। ২০২৩ সালের ব্যালন ডি’অরে রানার্সআপ হন, জেতেন গার্ড মুলার ট্রফিও।
জাতীয় দলে সাফল্য
জাতীয় দলের হয়েও তিনি সমান দুর্দান্ত। ২০১৯ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে হন্ডুরাসের বিপক্ষে এক ম্যাচে ৯ গোল করে গড়েন অবিশ্বাস্য রেকর্ড এবং জেতেন গোল্ডেন বুট। ২০২৪ সালে প্রথমবার নরওয়ের অধিনায়কত্ব করে স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে দেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। গত বছর বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আট ম্যাচে ১৬ গোল করে নরওয়েকে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরান। ইতালির বিপক্ষে সান সিরোতে জোড়া গোল করে ৪-১ জয়ের ম্যাচটি নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় রাত হয়ে আছে।
ব্যক্তিগত জীবন ও পৃষ্ঠপোষকতা
মাঠের বাইরে তার জীবনও ব্যতিক্রম। দীর্ঘদিনের সঙ্গী ইসাবেল হাউগসেং ইয়োহানসেন এবং তাদের সন্তানকে নিয়ে ব্যক্তিগত জীবন আড়ালেই রাখতে পছন্দ করেন। কঠোর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং শারীরিক ফিটনেসের প্রতি অসাধারণ মনোযোগই তার সাফল্যের অন্যতম রহস্য। নাইকি, ডলচে অ্যান্ড গাব্বানা, ব্রাইটলিং, হাইপারআইস, ইএ স্পোর্টস, ভায়াপ্লের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের সঙ্গে রয়েছে তার চুক্তি।



