আর্লিং হলান্ড: বিশ্বকাপের অসমাপ্ত নায়ক যিনি নরওয়েকে নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছেন
হলান্ড: বিশ্বকাপের অসমাপ্ত নায়ক, নরওয়ের নতুন স্বপ্ন

মাত্র ২৬ বছর বয়সেই ইউরোপীয় ফুটবলের প্রায় সব বড় মঞ্চে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন আর্লিং হলান্ড। অস্ট্রিয়ার রেড বুল সাল্‌ৎসবুর্গ থেকে জার্মানির বরুসিয়া ডর্টমুন্ড, এরপর ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার সিটিতে এসে গোল করার সংজ্ঞাই যেন নতুন করে লিখেছেন তিনি। প্রিমিয়ার লিগে অভিষেক মৌসুমেই গোলের রেকর্ড, একাধিক লিগ শিরোপা, ট্রেবল জয়, উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ—ব্যক্তিগত ও ক্লাব ক্যারিয়ারে সাফল্যের প্রায় সব অধ্যায়ই খুব অল্প বয়সে স্পর্শ করেছেন। অথচ একটি অপূর্ণতা সব সময়ই তাঁকে অনুসরণ করেছে—নিজের দেশ নরওয়েকে বিশ্বকাপের বড় মঞ্চে তুলে আনা।

২৮ বছরের অপূর্ণতা পূরণ

সেই অপূর্ণতা পূর্ণতা পেল ২০২৬ সালে। দীর্ঘ ২৮ বছর পর, ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো নরওয়ে বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেয়। বাছাইপর্বে দুর্দান্ত নৈপুণ্য, ইতালির মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারানো এবং গোলের পর গোল করে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া—সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিলেন আর্লিং হলান্ড। বিশ্বকাপেও সেই ধারাবাহিকতা অটুট ছিল।

ব্রাজিলের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়

রাউন্ড অব সিক্সটিনে প্রতিপক্ষ ছিল পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। কোটি কোটি সমর্থকের হেক্সা-স্বপ্নের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন মানুষ। ম্যাচের শেষ ভাগে তাঁর জোড়া গোলে নরওয়ে ২–১ ব্যবধানে ব্রাজিলকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায়। ফুটবলবিশ্ব আবারও উপলব্ধি করে—সুযোগ পেলেই ম্যাচের ভাগ্য একাই বদলে দিতে পারেন হলান্ড।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইংল্যান্ডের কাছে হৃদয়বিদারক হার

কিন্তু বিশ্বকাপ কেবল নায়কের গল্প লেখে না। কখনো কখনো নায়ককেও অসমাপ্ত রেখেই শেষ অধ্যায়ে পৌঁছে যায়। কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। শুরুটা হয়েছিল স্বপ্নের মতো। আন্দ্রেয়াস স্কেলদেরুপের গোলে এগিয়ে যায় নরওয়ে। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে জুড বেলিংহ্যামের অসাধারণ প্রত্যাবর্তনে ২–১ ব্যবধানে হেরে যায় নরওয়ে। সেমিফাইনালের দরজা থেকে ফিরে যেতে হয় হলান্ডদের। পরিসংখ্যান বলবে—নরওয়ে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু পরিসংখ্যান কখনো পুরো গল্প বলে না।

এক জাতির আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছেন

এই বিশ্বকাপে হলান্ড শুধু গোল করেননি। একটি জাতির আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছেন। ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তিনি নরওয়েকে আবারও বিশ্বফুটবলের আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছেন। ছোট্ট একটি দেশের মানুষের স্বপ্নকে তিনি বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিয়েছেন। এই অর্জন কোনো ট্রফির চেয়েও ছোট নয়।

নেতা হিসেবে পরিচয়

মহান খেলোয়াড়দের আলাদা করে চেনা যায় তাঁদের মানসিকতায়। প্রতিপক্ষের রক্ষণ তাঁকে আটকে রাখতে পারে; কিন্তু তাঁর লড়াই করার ইচ্ছাকে নয়। ব্রাজিলের বিপক্ষে ইতিহাস গড়া সেই রাত হোক কিংবা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চোখে হতাশা নিয়েও শেষ বাঁশি পর্যন্ত লড়ে যাওয়া—হলান্ড প্রতিটি মুহূর্তে একজন নেতার পরিচয় দিয়েছেন। বিশ্বকাপে সবাই চ্যাম্পিয়ন হয় না; কিন্তু কিছু মানুষ ট্রফি ছাড়াই ইতিহাসের অংশ হয়ে যান।

ট্রফির চেয়েও বড় অর্জন

হলান্ড প্রমাণ করেছেন—কখনো কখনো একজন খেলোয়াড়ের মহত্ত্ব মাপা হয় না তাঁর ট্রফির সংখ্যায়। মাপা হয় তিনি কত মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, কত মানুষকে বিশ্বাস করিয়েছেন যে দীর্ঘ অপেক্ষারও একদিন শেষ হয়। নরওয়ের ২০২৬ বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হয়েছে; কিন্তু আর্লিং হলান্ডের কিংবদন্তি হওয়ার যাত্রা হয়তো কেবল শুরু।