ব্রাজিলের চার বছরের অস্থিরতা: নেইমারের হতাশা থেকে আনচেলত্তির যাত্রা
ব্রাজিলের চার বছরের অস্থিরতা: নেইমার থেকে আনচেলত্তি

রিও ডে জেনিরোয় ব্রাজিলের বিশ্বকাপ–যাপন!

‘মনে হচ্ছিল আমি কফিনের ভেতরে শুয়ে আছি আর সবাই এসে জিজ্ঞাসা করছে, “আরে, তুমি এখনো বেঁচে আছো?”’ কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ব্রাজিলের বিদায়ের পর নিজের মানসিক অবস্থার কথা বলতে গিয়ে গত এপ্রিলে এ কথাটিই বলেছিলেন নেইমার। এক পডকাস্টে ব্রাজিল তারকা জানান, সেই হতাশা এতটাই গভীর ছিল যে তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি যেন নিজের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াই দেখছেন।

২০২২ সালের ৯ ডিসেম্বর ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায়ের সেই দুঃস্বপ্ন এখন অতীত। নতুন বিশ্বকাপ, নতুন কোচ, নতুন আশা নিয়ে আবারও বিশ্বমঞ্চে ফিরেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। মরক্কোর বিপক্ষে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের আগে ফিরে দেখা যাক, কাতার থেকে উত্তর আমেরিকা—এই চার বছরে ব্রাজিল ফুটবলের গল্পটা কেমন ছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্ধেক ম্যাচে জয়হীন

কাতার বিশ্বকাপের পর থেকে এ পর্যন্ত ৩৮টি ম্যাচ খেলেছে ব্রাজিল। এর মধ্যে রয়েছে কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব, আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ ও বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ম্যাচ। এই ৩৮ ম্যাচে ব্রাজিল জিতেছে ১৯টিতে। বাকি ১৯ ম্যাচের মধ্যে ১০টিতে হার আর ৯টিতে ড্র। অর্থাৎ চার বছরে খেলা ম্যাচগুলোর অর্ধেকেই জয় পায়নি ব্রাজিল।

কোচ এলেন, কোচ গেলেন

২০২২ বিশ্বকাপ–ব্যর্থতার পর দায়িত্ব ছাড়েন তিতে। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে দায়িত্ব পান ব্রাজিল অনূর্ধ্ব–২০ দলের কোচ র্যামন মেনেজেস। প্রায় ছয় মাস দায়িত্বে ছিলেন তিনি। এরপর দায়িত্ব দেওয়া হয় ফার্নান্দো দিনিজকে; কিন্তু বিশ্বকাপ বাছাইয়ে টানা তিন ম্যাচে হারার পর তাঁর অধ্যায়ও দীর্ঘ হয়নি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ব্রাজিলের কোচ হন দরিভাল জুনিয়র। তাঁর অধীনে দল কোপা আমেরিকার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। তবে ২০২৫ সালের মার্চে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আর্জেন্টিনার কাছে ৪–১ গোলে হারের তিন দিনের মাথায় তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। সর্বশেষে ২০২৫ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে দায়িত্ব পান কার্লো আনচেলত্তি। নিজেদের ইতিহাসে প্রথম কোনো বিদেশি (ইতালিয়ান) কোচ নিয়ে বিশ্বকাপে নামছে ব্রাজিল।

শিরোপার খাতা শূন্য

এই চার বছরে ব্রাজিল জাতীয় দল কোনো শিরোপা জিততে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ২০২৪ কোপা আমেরিকায় টাইব্রেকারে উরুগুয়ের কাছে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নেয় তারা। অন্যদিকে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও খুব একটা স্বস্তিতে ছিল না দলটি। লাতিন আমেরিকা থেকে যে ছয়টি দল বিশ্বকাপে খেলা নিশ্চিত করে, তাদের মধ্যে পয়েন্ট তালিকায় ব্রাজিলের অবস্থান ছিল পঞ্চম।

বিশ্বকাপ বাছাইয়ে টালমাটাল যাত্রা

কনমেবল বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ১৮ ম্যাচে ব্রাজিল জিতেছে ৮টিতে। বাকি ১০ ম্যাচের মধ্যে ৬টিতে হার এবং ৪টিতে ড্র। বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনার সঙ্গে দুটি ম্যাচ খেলে দুটিতেই হেরেছে ব্রাজিল। এ ছাড়া কলম্বিয়া, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া ও ভেনেজুয়েলার কাছেও হার দেখতে হয়েছে। বিশেষ করে কলম্বিয়ার বিপক্ষে এই হার ছিল ঐতিহাসিক। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ইতিহাসে এর আগে কখনো কলম্বিয়ার কাছে হারেনি ব্রাজিল।

পুরো বাছাইপর্বে তিনজন ভিন্ন কোচের অধীনে খেলেছে দলটি। আর সর্বোচ্চ ৫ গোল করেছেন রাফিনিয়া।

নেইমারের ৪ ম্যাচ

২০২২ বিশ্বকাপের পর নেইমারের সময় কেটেছে চোট আর পুনর্বাসনে। গত সাড়ে তিন বছরে তিনি ব্রাজিলের হয়ে মাঠে নেমেছেন মাত্র ৪টিতে। এর মধ্যে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বলিভিয়ার বিপক্ষে ৫–১ গোলের জয়ে দুটি গোল করে পেলের ৭৭ গোলের রেকর্ড ভেঙে ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন নেইমার; কিন্তু পরের মাসেই উরুগুয়ের বিপক্ষে চোটে পড়ে মাঠ ছাড়েন তিনি। সেটিই এখন পর্যন্ত ব্রাজিলের জার্সিতে তাঁর শেষ ম্যাচ।

সব মিলিয়ে ২০২২ থেকে ২০২৬—ব্রাজিলের এই চার বছর ছিল অস্থিরতার গল্প। তিন বছরের মধ্যে চার কোচ, কোনো শিরোপা নেই, কোপা আমেরিকায় কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায়, আর বিশ্বকাপ বাছাইয়ে পঞ্চম স্থানে থেকে কোনোমতে সরাসরি বিশ্বকাপ নিশ্চিত করা।

একসময় যে দলকে বিশ্বকাপের আগে স্বাভাবিকভাবেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার ধরা হতো, সেই ব্রাজিল এবার বিশ্বকাপে এসেছে কিছুটা ভিন্ন পরিচয়ে—প্রশ্ন বেশি, উত্তর কম। এখন দেখার বিষয়, আনচেলত্তির অধীনে এই নতুন অধ্যায়ের শুরুটা কেমন হয়।