বাংলার ফুটবলজ্বর: ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন
বাংলার ফুটবলজ্বর: ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতি

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বাংলাদেশে ফুটবলের সূচনা ও প্রসার

বাংলাদেশে ফুটবল এসেছে উনিশ শতকের শেষের দিকে। এ দেশের ফুটবল বিশারদদের মতে, উপমহাদেশে বাঙালিরাই ফুটবলচর্চার পথিকৃত। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকেই বাঙালি ফুটবলপাগল হয়ে উঠতে শুরু করে। প্রথমে পাগলামি শুরু হয় নিজেদের খেলা নিয়ে। তারপর দীর্ঘদিন বাদে এখন বাঙালি পাগল অন্যের ফুটবল খেলা দেখে। বিশ্বকাপের খেলা এলেই খবরের কাগজে শিরোনাম বেরোয় সারা দুনিয়ার সঙ্গে ফুটবলজ্বরে কাঁপছে বাংলাদেশ। ‘ফুটবলজ্বর’ হাল আমলের জার্নালিজম শব্দ। তবে বেশ জুতসই।

ফুটবলজ্বর: ক্রনিক ও জটিল

বাঙালির ফুটবলজ্বর হোমিওপ্যাথিক পরিভাষায় ‘ক্রনিক’ অর্থাৎ পুরোনো ও জটিল। বাঙালির বিশ্বকাপ-দর্শন তো সেদিনের ঘটনা। ফুটবলজ্বরের শুরু তারও আগে থেকে। এখন যেমন জার্মানি, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ইত্যাদি আগে ছিল মোহামেডান, ইস্ট বেঙ্গল, মোহনবাগান প্রভৃতি। নিজেদের খেলা নিয়ে এ দেশে ফুটবলজ্বরের সর্বশেষ প্রকোপ দেখা দিয়েছিল সম্ভবত আবাহনী-মোহামেডান-ব্রাদার্সের সময়ে। তারপর থেকে জ্বর কমে আসতে শুরু করে ক্রিকেটের চাপে। এখন বাঙালির ফুটবলজ্বর মোটামুটি চার বছর পর পর। অন্য সময়টাতে স্রেফ গা-গরম। তবু সব মিলিয়ে বাঙালি ফুটবলপাগল, জ্বরের কম বেশি যা-ই হোক না কেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাহিত্যে ফুটবলের প্রতিফলন

শরত্চন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসে ফুটবল ম্যাচ দিয়ে ইন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। ফুটবল খেলা নিয়ে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েনি বাংলাদেশে এমন গ্রাম বেশ দুর্লভ। গ্রামে হায়ারে খেলতে গিয়ে প্রাণ বাঁচানোর স্মৃতি মফঃস্বল শহরের অনেক ফুটবলারের দেহ-মনে এখনো জাগরূক। মারামারির শুরু কিন্তু সেই শ্রীকান্ত-যুগেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শান্তিনিকেতনে ফুটবল চর্চা

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ছেলেবেলাতে বলেছেন, ‘মাঠ জোড়া ফুটবল খেলার লম্ফঝম্ফ তখনও ছিল সমুদ্র পাড়ে।’ ছেলেবেলায় ফুটবল খেলা তাঁর কাছে লম্ফঝম্ফ মনে হলেও তিনি যখন শান্তিনিকেতন গড়লেন, তখন ঠিকই শান্তিনিকেতনের মাঠে সেই সমুদ্র পারের ফুটবল চালু করলেন। সাগরময় ঘোষ তাঁর বইয়ে শান্তিনিকেতনের এক অনবদ্য ফুটবল ম্যাচের বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর বর্ণনার কেন্দ্রে রয়েছেন এক ইংরেজির অধ্যাপক, যিনি তাঁর আবেদনপত্রে ‘অতিরিক্ত গুণাবলীর মধ্যে বিশেষ জোর দিয়েছিলেন এই বলে যে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন তিনি ওয়াইএমসিএ ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন ছিলেন একাধিক বৎসর এবং তাঁর অধিনায়কত্বে একাধিকবার তাঁর দল টুর্নামেন্টে শিল্ড ও কাপ বিজয়ী হয়েছে।’ সাগরময় ঘোষ বর্ণিত এ ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৩১ সালে, যখন তিনি ম্যাট্রিক পাস করে শান্তিনিকেতন কলেজে ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র। তাঁর বর্ণিত ফুটবল ম্যাচটি ড্র হয়েছিল এবং তাতে অংশ নিয়েছিলেন সেই বিখ্যাত খেলোয়াড় অধ্যাপক। তবে তিনি ছিলেন খেলা না খেলা খেলোয়াড়।

কল্লোল গোষ্ঠীর ফুটবলপ্রেম

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর ‘কল্লোল যুগ’-এ লিখছেন—‘কোনো এক গোরা টিমকে ছ’ছটা গোল দিলে মোহনবাগান। রবি বোস নামে নতুন এক খেলোয়াড় এসেছে ঢাকা থেকে—এ তারই কারুকার্য। সেইবার কি? না, যেবার মনা দত্ত পরপর তিনটে কর্নার শট থেকে হেড করে পর পর তিন তিনটে গোল দিলে ডি সি এল আইকে? মোট কথা ঢাকার লোক যখন এমন একটা অসাধ্য সাধন করল তখন মাঠ থেকে সিধে ঢাকায় চলে না যাওয়ার কোনো মানে হয় না। যে দেশে এমন খেলোয়াড় পাওয়া যায়, সে দেশটা কেমন দেখে আসা দরকার।’ সুতরাং খেলার মাঠ থেকে সোজা শেয়ালদা এসে ঢাকার ট্রেন ধরল তিনজন। দীনেশ রঞ্জন, নজরুল আর নৃপেন। সোজা বুদ্ধদেবের বাড়ি। বুদ্ধদেব বসুর ফুটবলপ্রেম ছিল না মোটেও। অচিন্ত্যকুমারের সঙ্গে সম্ভবত জীবনে একবারই কলকাতার মাঠে ফুটবল দেখতে গিয়েছিলেন। অচিন্ত্যকুমার জানাচ্ছেন, বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, ‘কর্নার আবার কাকে বলে?’

জসীমউদ্দীনের ফুটবল কবিতা

কল্লোল গোষ্ঠীর প্রায় সবাই ফুটবলভক্ত ছিলেন। নিয়মিত লেখক ও কবিদের একজন ছিলেন জসীমউদ্দীন। তাঁর ‘কবর’ কবিতা কল্লোল পত্রিকাতেই প্রথম বেরিয়েছিল। জসীমউদ্দীনের ফুটবলভক্তি প্রকাশ পেয়েছে তাঁর ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ কবিতায়। সম্ভবত প্রায় নিয়মিত ফুটবল খেলা দেখেছেন তিনি। তাঁর কবিতার খেলোয়াড়ের নাম ইমদাদ—‘সন্ধ্যাবেলায় খেলার মাঠেতে চেয়ে দেখি বিস্ময়ে/মোদের মেসের ইমদাদ হক আগে ছোটে বল লয়ে!/বাম পায়ে বল ড্রিবলিং করে ডান পায়ে মারে ঠেলা,/ভাঙা কয়খানা হাতে পায়ে তার বজ্র করিছে খেলা/চালাও চালাও আরও আগে যাও বাতাসের মতো ধাও/মারো জোরে মারো—গোলের ভেতরে বলেরে ছুঁড়িয়া দাও।’

ফুটবলবাতিক: বাঙালির অনন্য ভালোবাসা

মানুষের খেয়ালের অন্ত নেই। খেয়ালের সঙ্গে গোয়ার্তুমি মিশলে তা হয় খামখেয়াল, যদি যুক্ত হয় শৌখিনতা তা হলে তা হয় শখ। জ্ঞান এবং কাণ্ডজ্ঞান এক কথা নয়। খেয়াল থেকে এর যেকোনোটা ঝরে গেলে তা হয় বাতিক। তো ফুটবল নিয়ে বাঙালিকে দেখা গেছে তারা শুধু ফুটবলজ্বরেই ভোগে না, বাতিকেও ভোগে। এমন বাতিকের অবাক করা বর্ণনা দিয়েছেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত। মোহনবাগান ক্লাবের কতিপয় সদস্য, মোহনবাগানের খেলায় মাঠে ঢুকতেন না। বাইরে বসে থাকতেন। এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে একজন যা বলেছিলেন তা অচিন্ত্যকুমারের ভাষায়—‘আমরা তো বাই মাঠে ঢুকি না, বাইরেই বসে থাকি চিরদিন। আমরা non seeing মেম্বর।’ তার মানে? তার মানে আমরা অপয়া, অনামুখো, অলুক্ষণে, আমরা মাঠে ঢুকলেই মোহনবাগান নির্ঘাৎ হেরে যায়, মেম্বর হয়েও আমরা খেলা দেখি না, বাইরে বসে দাঁতে ঘাস কাটি আর চিত্কার শুনি।’ অচিন্ত্যকুমার বলেছেন, ‘এই অপূর্ব স্বার্থশূন্যতার কথা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার যোগ্য।’ ফুটবল নিয়ে দেশে দেশে নানা কথা আছে। কিন্তু এমন ত্যাগের কথা বাঙালি ছাড়া অন্য কোনো জাতির ইতিহাসে নেই। গত শতকের দ্বিতীয় থেকে অন্তত ষষ্ঠ দশক পর্যন্ত বাঙালিরা ফুটবলকে এভাবেই ভালোবেসেছে।