ফুটবলের নিয়ম বদলে দেওয়া আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি আন্তোনিও রাত্তিন মারা গেছেন
ফুটবলের নিয়ম বদলে দেওয়া আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি রাত্তিন মারা গেছেন

মারা গেছেন আর্জেন্টিনার সাবেক ফুটবলার আন্তোনিও রাত্তিন। বোকা জুনিয়র্স ক্লাব কর্তৃপক্ষ লা নাসিওনকে এই খবর নিশ্চিত করেছে। খেলোয়াড়ি জীবনে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

জন্ম ও ক্লাব ক্যারিয়ার

১৯৩৭ সালের ১৬ মে টিগ্রেতে জন্ম নেওয়া রাত্তিন ছিলেন একজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার। পুরো ক্যারিয়ারই কাটিয়েছেন বোকা জুনিয়র্সে। ১৯৫৬ সালে লা বম্বোনেরায় রিভারপ্লেটের বিপক্ষে অভিষেক হয় তার। ১৯৭০ সালে অবসর নেন তিনি।

১৯৬৬ বিশ্বকাপের আইকনিক মুহূর্ত

১৯৬৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে এক আইকনিক মুহূর্তের কেন্দ্রে ছিলেন রাত্তিন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রেইটলাইনের মৌখিক নির্দেশে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। তখনো হলুদ বা লাল কার্ডের প্রচলন হয়নি। মাঠ ছাড়ার আগে ব্রিটিশ পতাকাসংবলিত একটি ব্যানার হাত দিয়ে খামচে ধরেছিলেন তিনি। ম্যাচের প্রথমার্ধেই এই ঘটনা ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত স্বাগতিক ইংল্যান্ড ১-০ গোলে জেতে সেই ম্যাচ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সেই সময় ক্রীড়াঙ্গনে ‘রাতা’ নামে পরিচিত রাত্তিন জানিয়েছিলেন, রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রানির লাল গালিচায় প্রায় পাঁচ মিনিট বসে ছিলেন তিনি। শুরুতে চকলেট ছুঁড়লেও পরে বিয়ারের ক্যান ছুঁড়তে শুরু করেছিলেন ইংলিশ সমর্থকরা, দশ বছর আগে লা নাসিওনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছিলেন তিনি। মাঠের বাইরের এই ঘটনার কোনো ফুটেজ বা ছবি অবশ্য পাওয়া যায়নি। তবে এই বহিষ্কারের ঘটনাই নিয়মে বড় পরিবর্তন এনেছিল। এরপর থেকেই ১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপ থেকে হলুদ ও লাল কার্ডের প্রচলন শুরু হয়। পাশাপাশি এই ঘটনা থেকেই জন্ম নেয় ইংল্যান্ডের সঙ্গে আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বোকা জুনিয়র্সে সাফল্য

বোকা জুনিয়র্সের যুব একাডেমি থেকে উঠে আসা রাত্তিন প্রথম বিভাগে অভিষেক ম্যাচেই রিভারপ্লেটের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ে দলের হয়ে অ্যাঞ্জেল লাব্রুনাকে সামলানোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এই পারফরম্যান্সের পরই বাকি মৌসুমে একাদশে জায়গা পাকা করে নেন তিনি। মাত্র একটি ক্লাবের হয়েই ১৪ বছর খেলেছেন রাত্তিন। এই সময়ে ৩৮২টি আনুষ্ঠানিক ম্যাচ খেলে ২৮টি গোল করেছেন তিনি এবং জিতেছেন ছয়টি শিরোপা। এর মধ্যে আছে ১৯৬২, ১৯৬৪ ও ১৯৬৫ সালের লিগ শিরোপা, ১৯৬৯ সালের কোপা আর্জেন্টিনা এবং ১৯৬৯ ও ১৯৭০ সালের ন্যাশনাল টুর্নামেন্টের দলের সদস্য ছিলেন তিনি। এছাড়া ১৯৬৩ সালে কোপা লিবার্তাদোরেসেও রানার্সআপ হয়েছিলেন।

জাতীয় দলের ক্যারিয়ার

জাতীয় দলে ১০ নম্বর জার্সি পরলেও মূলত রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার ছিলেন রাত্তিন। দুটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছেন তিনি, ১৯৬২ সালে একটি এবং ১৯৬৬ সালে চারটি ম্যাচ খেলেছেন। এছাড়া ১৯৫৯ ইকুয়েডর ও ১৯৬৭ উরুগুয়ে কোপা আমেরিকাতেও খেলেছেন তিনি, যেখানে দুবারই রানার্সআপ হয়েছিল আর্জেন্টিনা। প্রীতি ও সরকারি ম্যাচ মিলিয়ে জাতীয় দলের হয়ে ৩৩টি ম্যাচ খেলে একটি গোল করেছিলেন তিনি, যা এসেছিল ১৯৬৪ সালের ১৪ অক্টোবর চিলির বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্রয়ের ম্যাচে।

কোচিং ও রাজনৈতিক জীবন

খেলোয়াড়ি জীবন শেষে অল্প সময়ের জন্য কোচিংয়েও যুক্ত হয়েছিলেন রাত্তিন। ১৯৭৬ সালে এস্তুদিয়ান্তেস দে রিও কুয়ার্তো, ১৯৭৯ সালে হিমনাসিয়া দে লা প্লাতা এবং ১৯৮০ সালে বোকা জুনিয়র্সের কোচের দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। বোকার হয়ে মেট্রোপলিটানো টুর্নামেন্টে টানা ১২ ম্যাচ অপরাজিত থাকার পরও দল সপ্তম স্থানে শেষ করেছিল এবং ন্যাশনাল টুর্নামেন্টের প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নিয়েছিল।

ফুটবল থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে আবারও জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন রাত্তিন। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদ সদস্য এবং পেরোনিস্ত দলে যোগ দেওয়ার পর ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ভিসেন্তে লোপেজে কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।

শেষ জীবন ও মৃত্যু

জীবনের শেষ সাক্ষাৎকারগুলোতে গর্ব করে বলতেন, ‘আমার পুরো জীবনে মাত্র দুটি জার্সি পরেছি, বোকা এবং আর্জেন্টিনার।’ ২০১৯ সালে শেষবারের মতো জনসম্মুখে দেখা গিয়েছিল তাকে। এরপর কোভিড মহামারি এবং বয়সজনিত স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে গণজমায়েত থেকে দূরে সরে যান তিনি। এমনকি ক্লাবের মিউচুয়াল সংস্থার বরাতে জানা গেছে, রাত্তিনের নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী তার মরদেহ জনসম্মুখে শায়িত রাখা হবে না।