২০২৬ বিশ্বকাপ ট্রাম্প-ইনফান্তিনোর প্রহসন নয়, বরং মানুষের উৎসবে পরিণত হয়েছে
বিশ্বকাপ মানুষের উৎসবে পরিণত হয়েছে, প্রহসন নয়

কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপ এখন নকআউট পর্বে উপনীত হয়েছে। অর্থাৎ এখন আর কোনো ভুলের সুযোগ নেই; জিতলেই টিকে থাকা যাবে, হারলেই বিদায়। শুরুতে অনেক আশঙ্কা থাকলেও ধীরে ধীরে বোঝা যাচ্ছে, বিশ্বকাপটি সফলই হচ্ছে।

শুরুর দিকের হতাশা ও চ্যালেঞ্জ

শুরুর দিকে হতাশার যথেষ্ট কারণ ছিল। টিকিটের দাম এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে কিছু শহরে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ দেখতেই গড়ে এক হাজার ডলারের বেশি খরচ হচ্ছিল। আর গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচগুলোর টিকিটের দাম ছিল আরও অনেক বেশি। ফলে খেলা দেখা সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিল। এর পাশাপাশি তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন কিছু অংশগ্রহণকারী দেশের সঙ্গে এমন আচরণ করেছিল, যা সরাসরি অবজ্ঞার শামিল।

ইরানের দলকে প্রতিটি ম্যাচের পর মেক্সিকোতে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়। সোমালিয়ার শীর্ষ রেফারি ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। বহু সমর্থক ভিসা না পাওয়ায় খেলা দেখতে আসতেই পারেননি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইনফান্তিনোর অতিরঞ্জিত আত্মপ্রদর্শন

এর ওপর ছিল ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর অতিরঞ্জিত আত্মপ্রদর্শন। যেমনভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি এবং ওয়াশিংটনের আকাশরেখায় নিজের ছাপ বসিয়েছেন, তেমনভাবেই ইনফান্তিনো বিশ্ব ফুটবলের ওপর নিজের মুখ চাপিয়ে দিতে চেয়েছেন। এই দুই ব্যক্তির মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে—দুজনেই অতিরঞ্জনে বিশ্বাসী।

ইনফান্তিনো এই বিশ্বকাপকে ‘মানব–ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। ফরাসি বিপ্লব, ওয়াটারলুর যুদ্ধ বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডি-ডে—এসব কিছুই নয়, বরং একটি ফুটবল প্রতিযোগিতাই নাকি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা! তিনি ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার জন্যও জোরালো লবি করেছিলেন। তা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই ট্রাম্পকে প্রথম ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ তুলে দেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মানুষের উৎসবে পরিণত হওয়া বিশ্বকাপ

ফিফা নিঃসন্দেহে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থ উপার্জনের যন্ত্র। এই যন্ত্র স্বৈরশাসকদের ভাবমূর্তি পলিশ করতে দ্বিধা করে না। তবু এবারের বিশ্বকাপ উৎসব ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ রাজনীতির সম্পূর্ণ উল্টো এক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এই প্রতিযোগিতা ট্রাম্প বা ইনফান্তিনোর নয়, এটি বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষের, যাঁরা এটিকে নিজেদের উৎসবে পরিণত করেছেন।

ট্রাম্পের মতো ইনফান্তিনোরও স্বৈরশাসক ও কর্তৃত্ববাদী নেতাদের প্রতি দুর্বলতা রয়েছে। ২০১৮ সালের মস্কো বিশ্বকাপে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে তাঁর হাস্যোজ্জ্বল ছবি সেই প্রবণতারই প্রমাণ। তবে ট্রাম্প যেন তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। একবার হোয়াইট হাউসে গিয়ে ইনফান্তিনো বলেছিলেন, ‘আমি এখানে এসে নিজেকে ঘরের মতোই মনে করছি।’ ট্রাম্প সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেন, ‘এটাই তোমার ঘর।’ ট্রাম্পের নির্বাচনী বিজয়োৎসবে যোগ দিয়ে ইনফান্তিনো বলেছিলেন, ‘আমরা একসঙ্গে শুধু আমেরিকাকেই নয়, গোটা বিশ্বকেই আবার মহান করে তুলব।’

বাস্তবে যা ঘটেছে

এসব কারণে অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, এবারের বিশ্বকাপ বুঝি ট্রাম্প-ইনফান্তিনোর এক প্রহসনে পরিণত হবে। মনে হয়েছিল, ট্রাম্প হয়তো সব আলো নিজের দিকে টেনে নেবেন, অথবা ধনকুবের ও ক্ষমতাধরদের এক উৎসবে পরিণত হবে পুরো আয়োজন, যেখানে একদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত শক্তিধরেরা খেলা উপভোগ করবেন, আর অন্যদিকে মার্কিন অভিবাসন দপ্তরের কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষকে ধরে ধরে বের করে দেবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কিছু ঘটেনি।

হ্যাঁ, ইনফান্তিনো এখনো ব্যক্তিগত বিমানে করে উত্তর আমেরিকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, যেন প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই টেলিভিশনের ক্যামেরায় তাঁকে দেখা যায়। কিন্তু ট্রাম্পকে এখন পর্যন্ত কোথাও দেখা যায়নি। যদিও জানা গেছে, তিনি ১৯ জুলাই নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে উপস্থিত থাকবেন এবং বিজয়ী দলের হাতে ট্রফি তুলে দেবেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ছোট ছোট শহর যেন একেকটি অবিরাম ফুটবল উৎসবে পরিণত হয়েছে। সেখানে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা সমর্থকেরা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছেন।

অভিবাসন ও বহুসাংস্কৃতিকতার চিত্র

আলজেরিয়া, মিসর ও জর্ডানের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের মধ্যে অনেকেই ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। তাঁরা প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনের প্রতীক বহন করেছেন। জাতীয় ফুটবল দলগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইউরোপের সেরা দলগুলোর (যেমন ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডস) বড় অংশই অভিবাসী বা অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের নিয়ে গঠিত। জাপানের গোলরক্ষক জিয়ন সুজুকির বাবা ঘানার মানুষ, আর তাঁর জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। সাম্প্রতিক সময়ে কানাডাকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা মরক্কো দলটির অধিকাংশ খেলোয়াড়ই বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। যদি অভিবাসনের ইতিবাচক প্রভাবের কোনো জীবন্ত উদাহরণ খুঁজতে হয়, তবে বিশ্বমানের ফুটবলই তার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রমাণ।

গার্ডিয়ান পত্রিকার ক্রীড়া লেখক বার্নি রোনে একে বলেছেন ‘ডায়াসপোরা বিশ্বকাপ’। মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন শহরে সেই চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। যেসব স্থানীয় মানুষ আগে এই প্রতিযোগিতার দিকে খুব একটা নজর দেননি। তাঁরাও এখন উৎসবের আমেজে শরিক হয়েছেন। টেনেসির চ্যাটানুগায় স্পেন দলের আগমনে মানুষ স্যাংগ্রিয়ার (ওয়াইন বিশেষ) জগ আর তাপাসের (তাপাস বলতে স্পেনের ঐতিহ্যবাহী হালকা নাশতা বা ছোট পদ বোঝায়) প্লেট নিয়ে স্বাগত জানিয়েছে। আবার কানসাসের লরেন্স শহরে আলজেরিয়া দলকে স্বাগত জানাতে শোনা গেছে ‘ভিভা লালজেরি’ (আলজেরিয়া দীর্ঘজীবী হোক) ধ্বনি।

যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপের প্রভাব

খেলার ফলাফল নিয়ে যেমন অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হওয়া ঠিক নয়, তেমনই এ ধরনের আন্তর্জাতিক আয়োজনের প্রভাবও অনেক সময় অতিরঞ্জিত করে দেখা হয়। তবু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এই বিশ্বকাপের প্রভাব একেবারেই তুচ্ছ নয়। অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকের বৈশ্বিক ক্রীড়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই—তাঁদের ‘ওয়ার্ল্ড সিরিজ’ আসলে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু এবার নরওয়ে, মরক্কো, জাপানসহ নানা দেশের সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, দেশপ্রেম ও উৎসবমুখরতা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন অনেক মার্কিন নাগরিক। এর ফলে তাঁদের সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গিতে সামান্য হলেও পরিবর্তন আসতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরের বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতা। মেক্সিকো, হাইতি, ইকুয়েডর, সেনেগালসহ বিভিন্ন দেশের বংশোদ্ভূত মানুষেরা একসঙ্গে উৎসবে মেতেছেন। ট্রাম্প যদি মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাইতেনও, তাতে কাজ হতো না; কারণ, এই পরিবেশ তাঁর জন্য নয়। এটি তাঁর রাজনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।

ফিফা নিঃসন্দেহে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থ উপার্জনের যন্ত্র। এই যন্ত্র স্বৈরশাসকদের ভাবমূর্তি পলিশ করতে দ্বিধা করে না। তবু এবারের বিশ্বকাপ উৎসব ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ রাজনীতির সম্পূর্ণ উল্টো এক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এই প্রতিযোগিতা ট্রাম্প বা ইনফান্তিনোর নয়, এটি বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষের, যাঁরা এটিকে নিজেদের উৎসবে পরিণত করেছেন।

ইয়ান বুরুমা খ্যাতিমান মার্কিন লেখক। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত।