প্রথমবার অংশ নিয়েই এশিয়ান গেমসে খেলা নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। এশিয়ান হকি মাঠে নামার আগমুহূর্তে যখন ১৪ জোড়া হাত একে অপরকে শক্ত করে ধরে গোল হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে কোনো ব্যক্তি থাকে না। থাকে না নাটোরে ফেলে আসা মা-বাবার মুখ কিংবা ঝিনাইদহের মেঠো পথ। বিকেএসপির শৃঙ্খলে বেড়ে ওঠা এই কিশোরীদের ডায়েরির পাতাগুলো আলাদা হতে পারে, কিন্তু নীল টার্ফে স্টিক হাতে দাঁড়ালে সবার হৃৎস্পন্দন মিশে যায় এক বিন্দুতে। সেই বিন্দুর নাম বাংলাদেশ।
বিকেএসপি থেকে জাতীয় দল
২০২০ সালে বিকেএসপিতে শুরু হওয়া মেয়েদের হকির প্রথম ব্যাচের ছাত্রী অর্পিতা পালসহ সাতজনই আছেন বর্তমান জাতীয় দলে। ২০২১ থেকে ২০২৪ এই চার ব্যাচ থেকে এসেছে অন্য সাতজন। প্রথম দিকে সবাই সবার কাছে ছিলেন অচেনা। কেউ এসেছেন উত্তরবঙ্গের কনকনে শীত পেরিয়ে, কেউবা দক্ষিণ জনপদের কাদা–মাটি মেখে। গত তিন বছরে তাঁরাই একটা দল হয়ে উঠেছেন। বিকেএসপির এক ছাদের নিচের রাতগুলো কখন যে তাঁদের ‘সতীর্থ’ থেকে ‘রক্তের সম্পর্কহীন এক পরিবার’ বানিয়ে দিল, তা এক পরম বিস্ময়।
এশিয়ান গেমসের টিকিট নিশ্চিত
এশিয়ান গেমসের বাছাইয়ের গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচের দুটিতে জিতেছে মেয়েরা। জাকার্তায় গত পরশু হংকং চায়নাকে হারিয়ে এশিয়ান গেমসের টিকিট কাটার পর এই ‘পরিবার’টাই এখন দেশের হকির সবচেয়ে উজ্জ্বল বিজ্ঞাপন। বলা ভালো, পরিবারটা এখন আরেকটু বড়। ১৮ জনের স্কোয়াডের ১৪ জনই (হিমাদ্রী, নীলাদ্রী, রিয়াশা, নিনিসেন, তন্নি, ডনুচিং, অর্পিতা, শারিকা, ফাতেমা, আইরিন, ইমা, কনা, জাকিয়া ও সানজিদা) বিকেএসপির বর্তমান শিক্ষার্থী হলেও পরিবারটার সঙ্গে মিশে গেছেন বাকি ৪ জনও। এই চারজনের দুজন মহুয়া আর নাদিরাও অবশ্য বিকেএসপিরই প্রাক্তন ছাত্রী। অন্য দুজন ফারদিয়া আক্তার ও রিতু আক্তার এসেছেন জেলা পর্যায় থেকে। তাঁদের বয়সের ব্যবধান যেমন খুব বেশি নয়, স্টিক হাতেও সবার লক্ষ্য অভিন্ন। মাঠের বাইরের আত্মার টানই দলটার বড় শক্তি, যা তাঁদের শিখিয়েছে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মরণপণ লড়তে।
অধিনায়কের ভাষ্য
অধিনায়ক অর্পিতা পাল দলের বোঝাপড়ার কথা জানাতে গিয়ে বলছিলেন, ‘অনুশীলন বা ম্যাচে কেউ ভুল করলে আমরা তাকে সাহস দিই, শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করি। এই বিশ্বাস এক–দুই দিনে তৈরি হয়নি। বিকেএসপিতে একসঙ্গে থাকতে থাকতে সবাই সবার আপন হয়ে গেছি। আমাদের কাছে দলটা একটা পরিবারের মতো।’
গোলদাতার প্রতিক্রিয়া
হংকংয়ের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করা কনা আক্তারের কথায়ও অদৃশ্য সুতোর গল্প, ‘হোস্টেলের রুমে ফেরার পর খেলা নিয়ে আমাদের মধ্যে অনেক কথা হয়। কে পাস দিতে দেরি করল, কার ডিফেন্স ভালো হয়নি...এসব নিয়ে অনেক কথা হয়। শুক্রবারে সবাই একসঙ্গে আড্ডা দিই, সেখানেও হকি নিয়ে আলোচনা হয়।’ দিনে কোচের কড়া শাসন আর রাতে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা; এভাবেই কাটছে তাঁদের দিন। তাঁদের অভিধানে ‘আমি’ শব্দটা অনেক আগেই মুছে গিয়ে জায়গা করে নিয়েছে ‘আমরা’। ইন্দোনেশিয়ায় প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়ে সেই ‘আমরা’রই জয়ধ্বনি শুনেছে সবাই।
সাফল্যের নেপথ্য
সাফল্যের নেপথ্যে কী আছে, সেটা বলেছেন দলের পেনাল্টি কর্নার বিশেষজ্ঞ আইরিন আক্তার, ‘বিকেএসপিতে ভর্তির পর প্রথম দিকে আমরা কারও সঙ্গে কেউ সেভাবে কথাও বলতাম না। এখন এমন হয়েছে, আমরা একে অন্যের চোখের ভাষাও বুঝি। এখানে (জাকার্তা) আসার পর একবারের জন্যও মনে হয়নি আমরা বিদেশে খেলছি। মনে হচ্ছিল আমরা বিকেএসপির মাঠেই আছি। এই সাহসটা তৈরি হয়েছে সবার সঙ্গে সবার বোঝাপড়ার জন্যই।’
ডিফেন্ডারের মতামত
ডিফেন্ডার রিয়াশা আক্তারের কণ্ঠেও একই কথার প্রতিধ্বনি, ‘অবসরে হকি নিয়েই বেশি কথা হয়। ম্যাচের আগে একজন আরেকজনকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেয়। শুধু খেলা নয়, সুখে–দুঃখেও সবাইকে পাশে পাওয়া যায়। কেউ অসুস্থ হলে বাকিরা খুব চিন্তায় পড়ে যায়।’ প্রথমবার বাছাইয়ে অংশ নিয়েই এশিয়ান গেমসে খেলা নিশ্চিত—বাংলাদেশের নারী হকির ইতিহাসে এ এক স্বপ্নিল যাত্রা। দলটার কাছে এই সাফল্য বিকেএসপির হোস্টেলে কাটানো বিনিদ্র রজনী, একসঙ্গে ঘাম ঝরানো আর হাজারো খুনসুটির চূড়ান্ত ফসল।
কোচের বক্তব্য
কোচ জাহিদ হোসেনও এ কথাই বলেছেন, ‘সবার মধ্যে এত ভালো বোঝাপড়া, মাঝেমধ্যে আমিও অবাক হতাম। কখনো তাদের ছন্নছাড়া মনে হয়নি। এই একতার শক্তিটা মাঠেও দেখছি।’
ঠিকানা, বয়স সবই ভিন্ন। তবু চোখের ভাষা আর মনের ভাষা একাকার হয়ে গিয়ে সবার হকির ভাষাটাও এখন এক। সে ভাষায় ফুটে উঠছে অদম্য হয়ে ওঠার গল্প লেখার নেশা।



