ভিনিসিয়ুসের গোল: ব্রাজিলের হারের মাঝে এক বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড
ভিনিসিয়ুসের গোল: ব্রাজিলের হারের মাঝে বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড

দুর্দান্ত গোলের আনন্দে ছুটলেন ভিনিসিয়ুস। রয়টার্সপ্রিগুইনো, লিওনিদাস, আদেমির, বালতাজার, মাজ্জোলা, জাগালো, পেলে, রিভেলিনো, জেয়ারজিনহো, রেইনালদো, সক্রেটিস, ক্যারেকা, রোমারিও, সিজার সাম্পাইও, রোনালদো, কাকা, মাইকন, নেইমার, কুতিনিও, রিচার্লিসন ও ভিনিসিয়ুস—নামের তালিকাটা বেশ লম্বা। তাঁরা সবাই বিশ্বকাপে একেক আসরে ব্রাজিলের প্রথম গোলদাতা। ভিনিসিয়ুসের নামটা সে তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন।

ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ‘গ্লোবো’র মতে, বিশ্বকাপে ব্রাজিলের অন্য সব প্রথম গোলের চেয়ে ভিনিসিয়ুসেরটি ব্যতিক্রম। অন্য সবার গোলের দিন দল ভালো খেলেছে, খারাপও খেলেছে। কিন্তু অন্তত ১৯৩৪ সালের পর বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আজকের মতো বাজে খেলা ব্রাজিল আগে খেলেনি। মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের দলীয় খেলার তুলনায় ভিনিসিয়ুসের গোলটি ছিল ‘মূল ভূখণ্ড’ থেকে অনেক অনেক দূরের এক বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের মতো—যার চারপাশে শুধু দুশ্চিন্তার ‘জলরাশি’।

ভিনিসিয়ুসের দুর্নাম ও প্রমাণ

ভিনিসিয়ুসও এত দিন সেই ‘জলরাশি’তে হাবুডুবু খেয়েছেন। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে এই ধারা অবশ্য নতুন নয়। একসময় রিভালদোকে নিয়েও বলা হতো, বার্সেলোনার জার্সিতে যতটা দেন, ব্রাজিলের জার্সিতে ততটা নয়। পরে তো ২০০২ বিশ্বকাপ জিতে সেই দুর্নাম ঘোচান রিভালদো। ভিনিসিয়ুসকে নিয়েও খোদ তাঁর জন্মভূমিতেই এমন কথা চাউর ছিল, রিয়াল মাদ্রিদই তাঁর সবকিছু!

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিসংখ্যান সাক্ষী হওয়ায় ভিনি এই দুর্নাম এত দিন ঘোচাতে পারেননি। কারণ, ব্রাজিলের হয়ে ৪৯ ম্যাচে ৯ গোল তাঁর পক্ষে দাঁড়ায়নি। পক্ষে দাঁড়াল ৫০তম ম্যাচে তাঁর দশম গোলটি। ২১ মিনিটে মরক্কোর গোলে হারের মুখে ছিল ব্রাজিল। সেটাও কেমন গুরুতর ব্যাপার—১৯৩৪ বিশ্বকাপের পর এই প্রথম নিজেদের শুরুর ম্যাচে হারের চোখরাঙানি!

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গোলের আগ মুহূর্তে ভিনির মুভ

ভিনি সেই চোখরাঙানিকে বশ মানিয়ে মায়াঞ্জন মেখেছেন দর্শকের চোখে। ৩২ মিনিটে ভিনির সেই মুহূর্তের সঙ্গে বাকি সময়ে ব্রাজিলের খেলার কোনো মিল নেই। যেন ভিনির কোনো ‘মাস্টারপিস’–এর পাশেই দলীয় খেলার কদর্য এক ছবি! দেখে চোখ ব্যথা করে। আর সেই ছবিও কেমন ‘সুরিয়াল’—রিয়ালের ডাগআউটে কার্লো আনচেলত্তি থাকতে যেভাবে গোল করতেন, এখনো যেভাবে করেন। বাঁ প্রান্ত দিয়ে কাট–ইন করে বক্সে ঢুকে ডান পায়ে শট—প্রতিপক্ষ জানে ঠিক এটাই হবে, কিন্তু ঠেকাতে পারে না। মরক্কোও পারেনি। সবাই জানে, ওই জায়গা থেকে ভিনিকে শট নিতে দেওয়া আর বুক পেতে বুলেটকে আমন্ত্রণ জানানো একই কথা!

বিশ্বকাপে এটা ভিনির দ্বিতীয় গোল। সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও দুটি। দুটি বিশ্বকাপে খেলে রোনালদিনিওর গোলসংখ্যাও দুই–ই। মজার ব্যাপার, ব্রাজিলিয়ানরা বিশ্বকাপে রোনালদিনিওর পারফরম্যান্সের সমালোচনা করেন না। কারণটা হয়তো ২০০২ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দরকারের সময় ফ্রি কিক থেকে কিংবদন্তির সেই অবিশ্বাস্য গোল। ভিনির আজকের গোলটিও এসেছে ব্রাজিলের খুব দরকারের সময়ে। তাহলে ভিনিকে নিয়ে সমালোচকদের মুখ বন্ধ হবে কি?

ভিনির প্রতি দায়বদ্ধতা

প্রতিভা–অবদান বিচারে ভিনি হয়তো এখনো ‘গাউচো’র ধারেকাছেও নেই। কিন্তু ব্রাজিলের জার্সির প্রতি ভিনির টানের প্রকাশটা যে বেড়েছে সেটাও বোঝা গেল মরক্কোর বিপক্ষে। ছন্নছাড়া মিডফিল্ডকে গোছাতে কখনো নিচে নেমেছেন, কখনো আবার বাঁ প্রান্ত থেকে সাঁই করে ডানে চলে গেছেন দলের খেলা গোছাতে। প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কাড়তেও দৌড়েছেন বেশ ভালোই।

তাতে ম্যাচসেরা হলেও ভিনি ঠিক সন্তুষ্ট হতে পারেননি, ‘একটি গোল করেছি। কিন্তু এটা বিশ্বাস করি যে আরও উন্নতি করা সম্ভব। আমার সেরা খেলার শতভাগ দিতে পারিনি। আক্রমণে–রক্ষণে ব্রাজিলকে আরও সাহায্য করতে পারতাম।’

ভিনির এই আক্ষেপটুকু ব্রাজিলের সমর্থকদের জন্য তৃপ্তির। কারণ এই খিদেটা না থাকলে বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে ২৪ বছরের শিরোপাখরা কাটানো সম্ভব নয়। আরও একটি বিষয় আছে। ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে ভিনি বিদেশি এক সাংবাদিকের প্রশ্নে স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলতে রাজি হননি, ‘আমি ব্রাজিলের সঙ্গে আছি। শুধু পর্তুগিজ ভাষাতেই কথা বলব।’

এরপরও যদি মনে হয় ব্রাজিলের জার্সির প্রতি ভিনির কোনো দরদ নেই তাহলে ‘বিগ ফিল’ লুই ফেলিপে স্কলারির কথাটা শুনতে পারেন। এক টিভি অনুষ্ঠানে ২০০২ বিশ্বকাপ জেতানো সাবেক এ কোচ জানিয়েছেন, এবার বিশ্বকাপে ৬ গোল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ভিনি।

সেই প্রতিশ্রুতি রাখতে পারুন বা না পারুন, ভিনি যে এবার আটঘাট বেঁধেই নেমেছেন সেটা বলে দিয়েছেন মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ শেষেই, ‘সর্বশেষ বিশ্বকাপে আমার বয়সটা অল্প ছিল। এখন অভিজ্ঞতা বেড়েছে। বেড়েছে চাপও। তবে সামনে যা কিছুই আসুক না কেন, আমি প্রস্তুত।’

গোলের পর ব্রাজিলের উদ্‌যাপনের মধ্যমণি ভিনি

ভিনির পারফরম্যান্সে শুধু ব্রাজিলের সমর্থক নয়, খুশি হবেন রিয়ালের সমর্থকেরাও। বিশ্বকাপে রিয়ালে খেলা ব্রাজিলের কোনো খেলোয়াড়ের এটা ষষ্ঠ গোল। ইউরোপে ক্লাবগুলোর মধ্যে শুধু বার্সেলোনা (২০), ইন্টার মিলান (১৫), পিএসজি (৯) এ তালিকায় রিয়ালের ওপরে। ভিনিকে এই পরিসংখ্যান এখন জানালে হয়তো কোনো হেলদোল দেখা যাবে না। কারণ, তাঁর মনে–মগজে এখন শুধুই ব্রাজিল।