বাতিস্তুতা: ফুটবলপ্রেমীদের স্বপ্ন দেখানো নিখুঁত গোলদাতার গল্প
বাতিস্তুতা: স্বপ্ন দেখানো নিখুঁত গোলদাতার গল্প

ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু স্ট্রাইকার আছেন, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গোল করার শিল্প। গ্যাব্রিয়েল ওমর বাতিস্তুতা ছিলেন সেই বিরল শ্রেণির একজন। তিনি শুধু গোল করতেন না, গোলকে রূপ দিতেন একেকটি শিল্পকর্মে। তার শক্তিশালী শট, নিখুঁত ফিনিশিং এবং অদম্য লড়াকু মানসিকতা তাকে পরিণত করেছিল ফুটবল বিশ্বের অন্যতম স্মরণীয় স্ট্রাইকারে।

প্রারম্ভিক জীবন ও ক্যারিয়ারের শুরু

১৯৬৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আর্জেন্টিনার আভেলানেদায় জন্ম নেওয়া বাতিস্তুতার পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় ১৯৮৮ সালে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে। প্রথম মৌসুমেই ২৪ ম্যাচে ৭ গোল করে তিনি দলকে কোপা লিবার্তাদোরেসের ফাইনালে পৌঁছাতে সহায়তা করেন। তার প্রতিভা দ্রুতই দেশের বড় ক্লাবগুলোর নজর কাড়ে। প্রথমে রিভার প্লেটে গেলেও সেখানে খুব বেশি সুযোগ পাননি। পরে ১৯৯০ সালে যোগ দেন বোকা জুনিয়র্সে।

বোকা জুনিয়র্সেই নিজেকে প্রকৃত গোলদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন বাতিস্তুতা। ১৯৯০-৯১ মৌসুমে ২৯ ম্যাচে ২৩ গোল করে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি। এ পারফরম্যান্সই ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফিওরেন্তিনায় কিংবদন্তি হয়ে ওঠা

১৯৯১ সালে ইতালির শীর্ষ লিগ সিরি আ’র ক্লাব ফিওরেন্তিনায় যোগ দেন বাতিস্তুতা। ফ্লোরেন্সে পৌঁছেই সমর্থকদের হৃদয় জয় করে নেন তিনি। প্রথম মৌসুমে করেন ১৪ গোল, পরের মৌসুমে ১৯। কিন্তু তার দ্বিতীয় মৌসুমে ফিওরেন্তিনা অবনমিত হয় সিরি ‘বি’-তে। তখন অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর ডাক উপেক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। কিন্তু বাতিস্তুতা ছিলেন ভিন্ন ধাতুর মানুষ। এসি মিলান বা রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও তিনি ফিওরেন্তিনাতেই থেকে যান। তাঁর ১৬ গোলের অবদানে দলটি আবারও সিরি ‘এ’-তে ফিরে আসে। এ সিদ্ধান্ত তাকে ফ্লোরেন্সের মানুষের কাছে কিংবদন্তির মর্যাদা এনে দেয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফ্লোরেন্সের ক্লাবটিতে কাটানো নয় বছরই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়। সেখানেই জন্ম নেয় ‘বাতিগোল’ নামটি।

২০০০ সালের মার্চ মাসে ইংল্যান্ডের ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে একটি ম্যাচে ফুটবল বিশ্ব আবারও দেখেছিল ‘বাতিগোল’-এর আসল রূপ। প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে বল পেয়ে তিনি প্রথমে ফাঁকি দেন ডিফেন্ডার ইয়াপ স্টামকে। এরপর যে শটটি নেন, সেটি বজ্রপাতের মতো ছুটে গিয়ে জড়িয়ে পড়ে জালে। গোলরক্ষক রেমন্ড ফন ডের গাউয়ের কিছুই করার ছিল না। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় ওল্ড ট্র্যাফোর্ড। অনেক ফুটবলপ্রেমীর মতো সেই গোলই অসংখ্য তরুণ সমর্থকের কাছে বাতিস্তুতাকে এক বিস্ময়ের নাম করে তোলে।

নয় বছরে ফিওরেন্তিনার জার্সিতে ২০০-এর বেশি গোল করেন বাতিস্তুতা। অনেকের মতে, তিনিই ক্লাবটির সর্বকালের সেরা ফুটবলার এবং নিঃসন্দেহে অন্যতম সেরা গোলদাতা।

রোমায় স্বপ্ন পূরণ

২০০০ সালে ফুটবল ইতিহাসের সে সময়ের অন্যতম ব্যয়বহুল ট্রান্সফারের মাধ্যমে তিনি যোগ দেন এএস রোমায়। ফিওরেন্তিনায় দীর্ঘ সময় কাটিয়েও যে সিরি আ শিরোপা জেতা সম্ভব হয়নি, রোমায় গিয়েই প্রথম মৌসুমে সেই স্বপ্ন পূরণ করেন। ২০০০-০১ মৌসুমে ২০ গোল করে রোমাকে স্কুডেত্তো জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। রোমার হয়ে জিতেছেন ইতালিয়ান সুপার কাপও।

২০০৩ সালে অল্প সময়ের জন্য ইন্টার মিলানে লোনে খেলেন বাতিস্তুতা। এরপর যোগ দেন কাতারের আল-আরাবি ক্লাবে। ২০০৩-০৪ মৌসুমে ২৫ গোল করে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন এবং দলকে শিরোপা জিততেও সামনে থেকে ভূমিকা রাখেন।

জাতীয় দলের সাফল্য

বিশ্বকাপ ছাড়া আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে বাতিস্তুতার সাফল্য ছিল ঈর্ষণীয়। ১৯৯১ সালে কোপা আমেরিকায় ৬ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোল স্কোরার হন। তার কাঁধে ভর করে ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা হয় কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন। ১৯৯২ সালের ফিফা কনফেডারেশন্স কাপেও আর্জেন্টিনা জেতে শিরোপা, বাতিস্তুতা হন সর্বোচ্চ গোল স্কোরার। ১৯৯৩ সালে আর্তেমিও ফ্রেঞ্চি ট্রফি জিততেও অবদান রাখেন।

তিনটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে মোট ১০ গোল করেন বাতিস্তুতা। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে গ্রিসের বিপক্ষে এবং ১৯৯৮ বিশ্বকাপে জ্যামাইকার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে তিনি দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা একমাত্র ফুটবলার।

অবসর পরবর্তী জীবন

২০০৫ সালে ফুটবলকে বিদায় জানানোর পর বাতিস্তুতা বেছে নেন একেবারেই ভিন্ন জীবন। কিছুদিন নির্মাণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে পুরোপুরি মনোযোগ দেন কৃষিকাজে। ২০০৭ সালে আর্জেন্টিনায় ফিরে তিনি কৃষিখাতকে নিজের নতুন কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন। বর্তমানে সান্তা ফে প্রদেশে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির একটি বিশাল খামার পরিচালনা করেন তিনি। সেখানে সয়াবিন, ভুট্টা ও সূর্যমুখী চাষের পাশাপাশি গবাদিপশু পালনও করা হয়।

‘বাতিগোল’ কেন অনন্য

গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা শুধু একজন গোলদাতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন আবেগ, লড়াই, বিশ্বস্ততা এবং নিষ্ঠার প্রতীক। আধুনিক ফুটবলে যখন অনেক খেলোয়াড় দ্রুত সাফল্যের খোঁজে ক্লাব বদল করেন, তখন বাতিস্তুতা দেখিয়েছিলেন ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ এবং সংগ্রামের মূল্য কতটা। তার গোলগুলো আজও ইউটিউবের ভিডিও নয়, ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে জীবন্ত। শক্তিশালী শট, দুর্দান্ত ফিনিশিং আর অবিশ্বাস্য লড়াকু মানসিকতার জন্য তিনি চিরকাল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।