টানা তৃতীয় সাফ জয়ের স্বপ্ন ভঙ্গ, বাংলাদেশের নারী ফুটবলের পতন
টানা তৃতীয় সাফ জয়ের স্বপ্ন ভঙ্গ বাংলাদেশের

টানা তৃতীয় সাফজয়ের স্বপ্ন পূরণ হয়নি বাংলাদেশের। বাফুফের একটি স্বপ্নের মৃত্যু ঘটল। সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার যে লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ দল গোয়ায় পা রেখেছিল, তা শেষ পর্যন্ত পূরণ হলো না। কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালায় গত দুই আসরে বাংলাদেশ যে দাপট, আধিপত্য আর শৈল্পিক ফুটবল দিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর ছড়ি ঘুরিয়েছিল, এবার গোয়ার মাঠে তার প্রতিফলনও দেখা যায়নি। এই না পারার পেছনে লুকিয়ে আছে অনেক কারণ।

অভিজ্ঞতার অভাব নাকি কৌশলগত ব্যর্থতা?

অনেকেই হয়তো এবারের আসরের দলটিকে অনভিজ্ঞ বলতে পারেন। দলের সিনিয়র এবং অভিজ্ঞ তারকাদের দল থেকে বাদ দেওয়া বা সাইডলাইনে বসিয়ে রাখাকে এই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে কেউ কেউ জোরালোভাবে তুলে আনবেন। তবে মুদ্রার অন্য পিঠও দেখতে হবে। এই তরুণ দলটিই কিন্তু কিছুদিন আগে প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপের মূল পর্বে খেলার গৌরব অর্জন করেছিল। এই দলটিই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে চীন ও উত্তর কোরিয়ার মতো এশিয়ান পরাশক্তির বিপক্ষে বুক চিতিয়ে লড়ে এসেছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, যে মেয়েরা এশিয়ার শীর্ষ দলগুলোর বিপক্ষে অমন লড়াকু ফুটবল উপহার দিল, তারা সাফের আঞ্চলিক মঞ্চে এসে এভাবে খেই হারিয়ে ফেলল কেন?

ট্রানজিশনে দুর্বলতা ও রক্ষণভাগের নড়বড়ে অবস্থা

প্রথমত, বাস্তবসম্মতভাবেই মেনে নিতে হবে যে ফুটবল মাঠে অন্য দলগুলো বেড়াতে আসে না। প্রতিবার বাংলাদেশই চ্যাম্পিয়ন ট্রফি ঘরে তুলবে, বিষয়টা এমন নয়। তবে হারের চেয়েও বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, দলের সেই চেনা শক্তি এবং ধার কোথাও যেন খর্ব হয়েছে। টুর্নামেন্টজুড়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌশলগত দুর্বলতা মনে হয়েছে ‘ট্রানজিশনে’। আগে মেয়েরা যেভাবে বিদ্যুৎ–গতিতে আক্রমণে উঠত এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকানোর জন্য ঠিক ততটাই দ্রুত রক্ষণে নেমে আসত, এবার সেই গতি আর বোঝাপড়ার অভাব দেখা গেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তাই প্রতিপক্ষের প্রতি–আক্রমণে বারবার কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশের রক্ষণভাগ। ভাবা যায়, মালদ্বীপের মতো তুলনামূলক দুর্বল দলের বিপক্ষে দুই গোলে এগিয়ে থাকার পরও রক্ষণভাগের ভুলে শেষ পর্যন্ত দুই গোল হজম করতে হয়েছে! আর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে গ্রুপ পর্ব ও ফাইনাল মিলিয়ে দুই ম্যাচে মোট ৬টি গোল খেতে হয়েছে বাংলাদেশকে। এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট, টুর্নামেন্টজুড়ে বাংলাদেশের রক্ষণভাগের কী নড়বড়ে অবস্থা ছিল।

খেলোয়াড়দের মানসিকতা ও পারফরম্যান্স

কিছু খেলোয়াড়ের মানসিকতার কড়া সমালোচনা করে বাটলার বলেছেন, দলের এক বা দুজন সিনিয়র খেলোয়াড় হয়তো একটু ‘কমফোর্ট জোন’ বা আরামদায়ক অবস্থায় চলে গেছেন। আফঈদা খন্দকার, কোহাতি কিসকু ও শামসুন্নাহারদের মতো ডিফেন্ডাররা খেই হারিয়েছেন। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে রক্ষণে এমন তালগোল পাকিয়ে ফেলার দৃশ্য বাংলাদেশের নারী ফুটবলে আগে দেখা যায়নি। একই অবস্থা গোলপোস্টের নিচেও। গোলরক্ষক মিলি আক্তার এশিয়ান কাপে অস্ট্রেলিয়ার মাঠে দুর্দান্ত সব সেভ দিয়ে দেশের মানুষের মন জয় করেছিলেন। কিন্তু গোয়া সাফে সেই পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পারেননি। টুর্নামেন্টজুড়ে মিলি হয়তো কয়েকটি ভালো সেভ দিয়েছেন, কিন্তু একজন নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক হিসেবে মিলির আরও অনেক ভালো করার সুযোগ ছিল। চার ম্যাচে ৯টি গোল হজম করাটা মিলির মতো প্রতিভাবান গোলরক্ষকের সঙ্গে বেমানানই।

গোলপোস্টের এই ব্যর্থতা অবশ্য একটি বড় বিতর্ককে উসকে দিয়েছে। গত দুটি সাফের সেরা গোলরক্ষক রূপনা চাকমা দলে থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে একটি ম্যাচও খেলানো হলো না? এটি কি রূপনার প্রতি অবিচার নয়? এমন প্রশ্নে প্রধান কোচ পিটার বাটলার পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, মিলির চোটের কারণে রূপনা সম্প্রতি থাইল্যান্ড সফরে নিজেকে প্রমাণ করতে এবং কোচকে মুগ্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অন্যদিকে মিলি তরুণ হলেও সে দুর্দান্ত কাজ করছে এবং সাফে ভুল করলেও দলে থাকার যোগ্য।

মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের সংকট

টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের মাঝমাঠে কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। দলের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার মণিকা চাকমার চোট এবং অফ-ফর্ম বাংলাদেশের জন্য সংকট তৈরি করেছিল। কোচ বাটলার তাঁকে মাঠে নামিয়েছিলেন তাঁর অভিজ্ঞতার জন্য, কিন্তু মণিকা তা করতে পারেননি। কোচ নিজেই ম্যাচ শেষে বলেছেন, মণিকা দীর্ঘদিন ধরে চেনা ছন্দে নেই। তবু তিনি তাঁর ওপর যে আস্থা রেখেছিলেন মণিকা তার প্রতিদান দিতে পারেননি। আস্থার প্রতিদান দিতে পারেননি মনিকা শামসুল হক। মারিয়া মান্দা মাঝমাঠে আপ্রাণ চেষ্টা করলেও নতুনদের সঙ্গে তাঁর রসায়নটা ঠিকঠাক জমে ওঠেনি। ফলে দলগতভাবে পরিকল্পিত আক্রমণ গড়ে তোলা সেভাবে সম্ভব হয়নি।

আক্রমণভাগে ঋতুপর্ণা চাকমা উজ্জ্বল ছিলেন। নিজের সেরাটা দিয়েছেন এবং যখনই গোলের খুব দরকার হয়েছে, তখনই ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। সেমিফাইনাল এবং ফাইনালে বাংলাদেশ যখনই প্রথম গোল খেয়ে ব্যাকফুটে চলে গিয়েছিল, ঋতুপর্ণাই দারুণ দুটি একক প্রচেষ্টার গোল করে দলকে সমতায় ফিরিয়েছিলেন। তবে আক্রমণের প্রধান অস্ত্র বা ‘নাম্বার নাইন’ পজিশনে খেলা আনিকা রানিয়া দলের প্রয়োজনের সময়েও নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি। মূলত অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার থেকে তাঁকে স্ট্রাইকার বানানো হয়েছিল। মালদ্বীপের বিপক্ষে ম্যাচের মাত্র ১১ সেকেন্ডে গোল করে আনিকা টুর্নামেন্টে স্বপ্নের মতো শুরু করলেও পরের ম্যাচগুলোয় আর কোনো কার্যকর অবদান রাখতে পারেননি। টুর্নামেন্টের ৪টি ম্যাচেই তাকে মূল একাদশে রাখা হয়েছিল, কিন্তু প্রতিবারই কোচ ৬০ মিনিটের আশেপাশেই তাঁকে মাঠ থেকে তুলে নিয়ে নিয়েছেন।

একইভাবে তহুরা খাতুন এবং শামসুন্নাহার জুনিয়রের খেলা দেখে মনে হয়েছে তাঁরা তাঁদের ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মটা পেছনে ফেলে এসেছেন। গত দুটি সাফে তাঁরা যেভাবে ব্যক্তিগত ঝলক দেখিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন, এবার তার ঘাটতি দেখা গেছে। দুজনই একাদশে অনিয়মিত ছিলেন এবং ফাইনালে তাঁদের সুযোগ দেওয়া হলেও তাঁরা সেই আস্থার প্রতিদান দিতে পারেননি।

কোচের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

কোচ পিটার বাটলার অবশ্য ম্যাচ শেষে দলের কৌশলগত পরিবর্তন ও উন্নতি নিয়ে বেশ ইতিবাচক দাবি করেছেন। তাঁর মতে, গ্রুপ পর্বের তুলনায় ফাইনালে দলের পারফরম্যান্সে বিশাল উন্নতি হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময়ের মধ্যে এটিই ছিল মেয়েদের অন্যতম সেরা খেলা। তবে কিছু খেলোয়াড়ের মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পিটার বাটলার। তিনি বলেছেন, দলের এক বা দুজন সিনিয়র খেলোয়াড় হয়তো একটু ‘কমফোর্ট জোন’ বা আরামদায়ক অবস্থায় চলে গেছেন। তাঁরা নিজেদের যতটুকু ভালো ভাবছেন, বাস্তবে তাঁরা এখন আর ততটা ভালো ফর্মে নেই। বাটলার আরও এক ধাপ এগিয়ে মন্তব্য করেন যে দলে এমন এক-দুজন খেলোয়াড় আছেন, যাঁরা ‘ব্যবহারের সময় পার হয়ে যাওয়ার’ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন।

অবশ্য এই ব্যর্থতার জন্য কেবল খেলোয়াড়দের বা কোচের রণকৌশলকে দায়ী করলে বাফুফের কাঠামোগত দুর্বলতা ঢাকা পড়ে যাবে। আমাদের দেশের ঘরোয়া নারী ফুটবলের কাঠামোর সঙ্গে ভারতের নিয়মিত ও পেশাদার কাঠামোর আকাশ-পাতাল তফাত। কোচ বাটলার মনে করিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশে মেয়েদের কোনো নিয়মিত বা সক্রিয় ফুটবল লিগ নেই। দীর্ঘ সময় ধরে খেলা না থাকায় ফুটবলারদের ম্যাচ ফিটনেস তৈরি হয় না এবং এতে কোচেরও হাত কিছুটা বাঁধা থাকে। অন্যদিকে ভারতীয় মেয়েরা প্রতি সপ্তাহে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়, যা তাঁদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে ধারাবাহিক পারফর্ম করতে সাহায্য করে।

কোচ হিসেবে বাটলার কোনো অজুহাত দিয়ে নিজের দায় এড়াতে চাননি। দলের সমস্ত টেকনিক্যাল বিষয়ের দায়ভার নিজের কাঁধেই নিয়ে তিনি বলেছেন, এর জন্য তিনি বাফুফের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। তবে টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার সঙ্গে বাংলাদেশে তাঁর ভবিষ্যতের অধ্যায়ও যে শেষ হতে চলেছে, তার ইঙ্গিতও দিয়ে রেখেছেন এই কোচ। ইংল্যান্ডে তাঁর পরিবার থাকার কারণে এবং নিজের চুক্তির মেয়াদ শেষ পর্যায়ে চলে আসায় হয়তো আর চুক্তি নবায়ন করবেন না। নিজেকে ‘ফায়ার ফাইটার’ বলা বাটলার এখন অন্য কোথাও নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ নেওয়ার কথা ভাবছেন।

বাফুফের জন্য করণীয়

বাটলারের বিদায়ী বার্তা এবং সাফের নির্মম অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) জন্য এখন বড় শিক্ষা নেওয়ার আছে। প্রতিভা চেনা এবং তা সঠিক কাঠামোর মধ্যে লালন-পালন করা বাফুফের বড় দায়িত্ব। যদি তারা দেশের নারী ফুটবলের অতীত গৌরব ও সাফল্য ধরে রাখতে চায়, তবে জোড়াতালির দল গঠন না করে ঘরোয়া লিগ সচল করা এবং দলের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে ভাবতে হবে। খেলোয়াড়দের জন্য নিয়মিত ও কার্যকর লিগ দরকার, তাঁদের বেড়ে ওঠা আর পুষ্টির বিষয়টা নিয়েও ভাবার সময় এসেছে। বাফুফে ভাববে কি?