মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা, ভিসা জটিলতা এবং দীর্ঘ ৪০ ঘণ্টার বাসযাত্রা—সব বাধা পেরিয়ে অবশেষে ২০২৬ বিশ্বকাপের পথে যাত্রা শুরু করেছে ইরান ফুটবল দল। কয়েক মাস ধরে অনিশ্চয়তায় থাকা দলটি শনিবার (৬ জুন) তুরস্কের আনতালিয়া থেকে মেক্সিকোর তিজুয়ানার উদ্দেশে রওনা দেয়। রোববার স্থানীয় সময় ভোরের দিকে তাদের সেখানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থা ও ভিসা জটিলতা
বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থার পর ইরানের টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল। তবে ফিফার আশ্বাস এবং ধারাবাহিক কূটনৈতিক আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ যাত্রা নিশ্চিত হয়। যাত্রার আগ মুহূর্তেও নতুন জটিলতা তৈরি হয়। মেক্সিকোর ভিসা পেলেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভিসা নিয়ে উদ্বেগে ছিল পুরো দল। তুরস্কে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার পর খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারা অপেক্ষায় ছিলেন অনুমোদনের জন্য।
শুক্রবার রাতে তারা জানতে পারেন, খেলোয়াড়, প্রধান কোচ আমির গালেনোই এবং তার কয়েকজন সহকারী ভিসা পেয়েছেন। কিন্তু দলের ব্যবস্থাপনা বিভাগের কিছু কর্মকর্তা, দুই বিশ্লেষক, নির্বাহী কর্মকর্তা ও মিডিয়া টিমের সদস্যসহ মোট ১৩ জন তখনও ভিসা পাননি। এ ঘটনায় ইরান শিবিরে উদ্বেগ তৈরি হয়। এক মার্কিন কর্মকর্তা পরে বলেন, প্রয়োজনীয় সহায়ক কর্মীদের ভিসা দেওয়া হয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ‘এ ব্যবস্থার অপব্যবহার করে সন্ত্রাসীদের প্রবেশ করতে দেবে না’।
ইরান ফুটবল ফেডারেশন (এফএফআইআরআই) এ বিষয়ে ফিফার হস্তক্ষেপ দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, জাতীয় দলের সঙ্গে থাকা এবং দলের কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় সব কর্মকর্তার ভিসা নিশ্চিত করা ফিফার দায়িত্ব।
মেক্সিকোতে বেসক্যাম্প
বিশ্বকাপের জন্য ইরানের বেসক্যাম্প এখন মেক্সিকোর সীমান্ত শহর তিজুয়ানা। শহরটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ডিয়েগোর ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত। কার্যত সীমান্তের অপর পাশেই অবস্থান করবে ইরান দল। শুরুতে তাদের পরিকল্পনা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় ক্যাম্প করা। পরে নিরাপত্তা, কনস্যুলার সহায়তা এবং আবহাওয়ার বিষয় বিবেচনা করে সেই পরিকল্পনা পরিবর্তন করা হয়। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, মেক্সিকোতে অবস্থান করলে চাপ কম থাকবে এবং প্রয়োজন হলে দেশটির ইরানি দূতাবাসের সহায়তাও পাওয়া যাবে।
যুদ্ধের মধ্যে ৪০ ঘণ্টার বাসযাত্রা
ইরানের বিশ্বকাপ প্রস্তুতির সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় ছিল মার্চ মাসে। তখন যুদ্ধ চলমান অবস্থায় তেহরান থেকে তুরস্কে পৌঁছাতে দলকে ৪০ ঘণ্টার দীর্ঘ বাসযাত্রা করতে হয়। দীর্ঘ ভ্রমণে ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দ বাসের মেঝেতে শুয়ে সময় কাটিয়েছিলেন। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও দলের ইরানভিত্তিক খেলোয়াড়রা প্রায় পুরো সময় একসঙ্গে ছিলেন। মার্চে তারা নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ২-১ গোলে হারে এবং কোস্টারিকার বিপক্ষে ৫-০ গোলের জয় পায়। এরপর দেশের ঘরোয়া লিগ স্থগিত হয়ে গেলে অধিকাংশ সময় তেহরানেই ক্যাম্প করে দলটি। চূড়ান্ত ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের ১৭ জনই স্থানীয় লিগের খেলোয়াড়।
আনতালিয়ায় শান্ত পরিবেশ
তুরস্কের আনতালিয়ায় ভূমধ্যসাগর উপকূলের বিলাসবহুল মারদান প্যালেস হোটেলে ছিল ইরান দলের ক্যাম্প। সেখানে খেলোয়াড়দের জন্য ছিল সমুদ্রস্নান, সুইমিং পুল, জিম, স্পা এবং মেডিটেশন সুবিধা। খেলোয়াড়রা নিয়মিত সিনেমাও দেখতেন। এর মধ্যে ছিল ২০০৭ এশিয়ান কাপজয়ী ইরাক দলের ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র। বিভিন্ন সংস্কৃতির খেলোয়াড়দের একতাবদ্ধ হয়ে সাফল্য অর্জনের গল্পকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিতে বলেন কোচ গালেনোই। ৬২ বছর বয়সি গালেনোই ইরানের বিরল দেশীয় কোচদের একজন। এর আগে ২০০৬, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে বিদেশি কোচদের অধীনেই খেলেছিল দলটি।
জাহানবাখশের নেতৃত্ব
সাবেক প্রিমিয়ার লিগ ক্লাব ব্রাইটনের উইঙ্গার আলিরেজা জাহানবাখশ এবার খেলতে যাচ্ছেন নিজের চতুর্থ বিশ্বকাপ। বর্তমানে বেলজিয়ামের ডেন্ডার ক্লাবে খেলেন তিনি। ৯৮ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা এ ফুটবলার বলেন, ‘আমাকে যদি ১২ বছর বয়সে বলা হতো, ২০ বছর পর তুমি চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলবে, তাহলে আমি হেসে উড়িয়ে দিতাম।’ তিনি স্বীকার করেন, চলমান পরিস্থিতিতে প্রস্তুতি সহজ ছিল না। তবে সিনিয়র খেলোয়াড়দের দায়িত্ব ছিল দলকে একত্র রাখা। জাহানবাখশ বলেন, ‘আমরা ছেলেদের বলি, বাইরের যা কিছু ঘটছে তা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। আমরা শুধু দলের ভেতরের পরিবেশ, ঐক্য এবং সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি নিজেও অবাক হয়েছি। দেশের পরিস্থিতি এবং পরিবার থেকে দূরে থাকার পরও ছেলেদের মধ্যে দারুণ বন্ধন তৈরি হয়েছে।’
যুদ্ধের মাঝেও শান্তির বার্তা
মার্চে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে খেলোয়াড়রা স্কুলব্যাগ হাতে মাঠে নামেন। যুদ্ধের প্রথম দিনে একটি স্কুলে নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে এ প্রতীকী কর্মসূচি পালন করা হয়। কোস্টারিকার বিপক্ষে ম্যাচের আগে নিহত ব্যক্তিদের ছবি এবং ক্ষতিগ্রস্ত ক্রীড়া স্থাপনার ছবি প্রদর্শন করা হয়। তেহরানের আজাদি কমপ্লেক্সের ১২ হাজার আসনের একটি ইনডোর স্টেডিয়ামও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সাম্প্রতিক দুটি প্রীতি ম্যাচে—গাম্বিয়া ও মালির বিপক্ষে—খেলোয়াড়রা জাতীয় প্রতীকের ওপর ডান হাত রেখে মাঠে নামেন। বিশ্বকাপেও একই প্রতীকী বার্তা বহাল থাকবে।
ফিফার সমর্থন
মার্চে আনতালিয়ায় ইরানের ম্যাচ দেখতে যান ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। কোস্টারিকার বিপক্ষে ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘সবকিছু ঠিক আছে’ এবং পুনরায় নিশ্চিত করেন যে ইরান বিশ্বকাপে খেলবে। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, ইনফান্তিনোর উপস্থিতি দলকে মানসিকভাবে বড় ধরনের ইতিবাচক শক্তি জুগিয়েছিল। পরবর্তীতে ইস্তাম্বুলে ফিফা মহাসচিব মাত্তিয়াস গ্রাফস্ট্রমের সঙ্গে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদী তাজের বৈঠক হয়। সেখানে বিশ্বকাপ আয়োজন, নিরাপত্তা ও অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
বিশ্বকাপের আগে আত্মবিশ্বাসী ইরান
বিশ্বকাপের আগে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে মালিকে ২-০ গোলে হারিয়েছে ইরান। সাঈদ এজাতোলাহি ও রামিন রেজাইয়ানের গোলে জয় পায় দলটি। দলের খেলার ধরন নিয়ে স্থানীয় এক তুর্কি ফুটবল এজেন্ট মন্তব্য করেন, ‘বোঝাই যায় তারা অনেক দিন ধরে একসঙ্গে খেলছে।’ এদিকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের উপস্থাপক পেইমান আসাদিয়ান বলেন, ‘আমরা সেখানে শুধু জিততে যেতে চাই, অন্য কিছু নয়।’ সাবেক কোচ ও বিশ্লেষক মেহদি তুতুনচির বিশ্বাস, ‘খেলোয়াড়রা যুক্তরাষ্ট্রে যাবে দুটি বিষয় দেখাতে—তারা শান্তির পক্ষে এবং তারা দলের শক্তি দেখাতে চায়।’ বিশ্বকাপে যদি নকআউট পর্বে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি হয়, তাহলে সেটি হবে বিশেষ এক ম্যাচ। তুতুনচি বলেন, ‘যুদ্ধ ও কঠিন সময় আছে, কিন্তু হয়তো ফুটবল একটি বন্ধুত্বপূর্ণ মুহূর্ত এনে দিতে পারে।’



