চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি ফুটবল দল টানা দুটি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পর ২০২৬ সালে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে মাঠে নামছে। ২০১৮ ও ২০২২ সালের হতাশাজনক ব্যর্থতা কাটিয়ে কোচ জুলিয়ান নাগেলসমানের অধীনে দলটি অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও সংগঠিত। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ছয় ম্যাচের মধ্যে পাঁচটিতে জয় পেয়ে সহজেই মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে জার্মানি।
গ্রুপ পর্বের জুজু কাটানোর মিশন
একসময়ের দাপুটে জার্মানি ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হেরে এবং ২০২২ সালে জাপানের কাছে পরাজয় ও গোল ব্যবধানের কারণে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়, যা ফুটবল বিশ্বকে অবাক করেছিল। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর নাগেলসমান দলটিকে নতুন করে গড়ে তোলেন। ইউরো ২০২৪-এ স্বাগতিক হিসেবে ভালো খেললেও কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে যায়। তবে এখন দলের ভেতরে আশার আবহ বিরাজ করছে।
আক্রমণে তরুণদের ওপর ভরসা
জার্মানির বিশ্বকাপ স্বপ্নের কেন্দ্রে রয়েছেন জামাল মুসিয়ালা, ফ্লোরিয়ান ভির্টজ ও লেনার্ট কার্ল। ২৩ বছর বয়সী মুসিয়ালা ইউরো ২০২৪-এ দলের সেরা খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন। তবে ২০২৫ সালে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ক্লাব বিশ্বকাপে পা ভেঙে ও গোড়ালির স্থানচ্যুতিতে পড়ে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ছিলেন। এখন ধীরে ধীরে ফিরলেও পুরোপুরি ছন্দে ফেরেননি। অন্যদিকে, লিভারপুলে যোগ দেওয়ার পর মৌসুমের শুরুটা কঠিন হলেও এখন নিজের সেরা ফর্মে ফিরছেন ফ্লোরিয়ান ভির্টজ। আক্রমণের বিভিন্ন পজিশনে খেলতে সক্ষম এই মিডফিল্ডার যে কোনো রক্ষণভাগ ভেঙে দিতে পারেন। ১৮ বছর বয়সী লেনার্ট কার্ল জার্মান ফুটবলের নতুন বিস্ময়। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও বুন্দেসলিগায় কম বয়সে গোল করে নজর কেড়েছেন। তার ড্রিবলিং ও নিচু ভারকেন্দ্রের কারণে অনেকেই তাকে লিওনেল মেসির সঙ্গে তুলনা করছেন।
নয়ারের চমকপ্রদ প্রত্যাবর্তন
৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়ার ইউরো ২০২৪-এর পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছিলেন। তবে বিশ্বকাপের জন্য আবারও জাতীয় দলে ফিরেছেন তিনি। কোচ নাগেলসমান জানিয়েছেন, অলিভার বাউমান ও আলেকজান্ডার ন্যুবেলের আগে নয়ারই প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক। দীর্ঘদিন জার্মানির অধিনায়ক থাকা নয়ারের প্রত্যাবর্তনের পরও অধিনায়কের আর্মব্যান্ড জোশুয়া কিমিখের কাছেই থাকছে।
নাগেলসমানের সামনে প্রশ্ন
মিডফিল্ডে লিওন গোরেটস্কা ও আলেকজান্ডার পাভলোভিচের জুটি এবং ডান প্রান্তে কিমিখের অবস্থান প্রায় নিশ্চিত। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন স্ট্রাইকার পজিশন নিয়ে। জার্মানির দলে বর্তমানে বিশ্বমানের কোনো খাঁটি স্ট্রাইকার নেই। নিকলাস ফুলক্রুগ বাজে মৌসুম কাটানোর কারণে দলে সুযোগ পাননি। নিউক্যাসলের নিক ভল্টেমাডে দলে থাকলেও তিনি মূলত অ্যাটাকিং মিডফিল্ড থেকে খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ফলে আর্সেনালের কাই হাভার্টজকে ‘ফলস নাইন’ হিসেবে খেলানোর সম্ভাবনাই বেশি।
তুলনামূলক সহজ গ্রুপ
গ্রুপ ‘ই’-তে জার্মানির প্রতিপক্ষ কুরাসাও, আইভরি কোস্ট ও ইকুয়েডর। কাগজে-কলমে জার্মানি এই গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী দল। তাই নকআউট পর্বে ওঠাই তাদের লক্ষ্য নয়, বরং প্রত্যাশা। আইভরি কোস্ট কিছুটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে, আর দক্ষিণ আমেরিকার শক্তিশালী বাছাইপর্ব পেরিয়ে আসা ইকুয়েডরও কঠিন প্রতিপক্ষ হতে পারে। তবুও জার্মানি আত্মবিশ্বাসী যে ২০১৪ সালের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নিতে পারবে তারা।
জার্মানির গ্রুপ পর্বের সূচি
- ১৪ জুন: জার্মানি বনাম কুরাসাও (হিউস্টন, যুক্তরাষ্ট্র)
- ২০ জুন: জার্মানি বনাম আইভরি কোস্ট (টরন্টো, কানাডা)
- ২৫ জুন: ইকুয়েডর বনাম জার্মানি (ইস্ট রাদারফোর্ড, নিউ জার্সি, যুক্তরাষ্ট্র)
মুসিয়ালা ও ভির্টজ যদি সেরা ফর্মে থাকেন, তাহলে জার্মানি যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্যই হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তবে বিশ্বমানের একজন স্ট্রাইকারের অভাব তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। তবুও নাগেলসমানের নেতৃত্বে নতুন প্রজন্মের এই জার্মানি আবারও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শক্তি প্রমাণ করতে প্রস্তুত। বাকিটা সময়ই বলে দেবে।



