২০১৮ ও ২০২২ সালের পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও খেলা হচ্ছে না ইতালির। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসরে সুযোগ পেতে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা পার করতে হয়। কিন্তু ইতালি বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। এই ব্যর্থতা নিয়ে হইচইয়ের কারণ কী?
ইতালির ফুটবল সংস্কৃতি
ইতালি ইউরোপের সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল। রোমান সভ্যতা, সঙ্গীত, সাহিত্য, ফ্যাশন আর খাবারের পাশাপাশি তাদের ধ্যানজ্ঞান জুড়ে ফুটবল। ইতালিয়ানরা ফুটবলকে 'ক্যালসিও' বলে ডাকে। দেশটার আকৃতি ফুটবল বুট পরা পায়ের মতো, সামনে সিসিলি দ্বীপ যেন বল। সব বয়সী মানুষ ফুটবল খেলে, দেখে, গল্প করে। ছোট-বড় সব শহরে ফুটবল ক্লাব আছে। জুভেন্টাস, এসি মিলান, ইন্টার মিলান, রোমা বিশ্ববিখ্যাত। সিরি আ ইউরোপের সেরা চার লিগের একটি। ম্যারাডোনা নাপোলির হয়ে খেলে ইতালিতে কাটিয়েছেন জীবনের বড় অংশ। ইতালির ফ্যানরা উন্মাদ, জাতীয় দলকে 'আজ্জুরি' বলে ডাকে। স্লোগান: 'ফোর্জা আজ্জুরি!'
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ইতালি
প্রথম দুই শিরোপা
১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে খেলেনি ইতালি। ১৯৩৪ সালে ঘরের মাঠে প্রথমবার নেমেই চেকোস্লোভাকিয়াকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৩৮ সালে টানা দ্বিতীয়বার হাঙ্গেরিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে শিরোপা ধরে রাখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০ সালে আবার বিশ্বকাপ শুরু হলে ইতালি গ্রুপ পর্বে বাদ পড়ে। ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৬-এও গ্রুপ পর্বে বাদ। ১৯৫৮-এ খেলারই সুযোগ পায়নি। অনেকে ধরে নিয়েছিল ইতালির সোনালি যুগ শেষ।
১৯৭০: শতাব্দীর সেরা ম্যাচ
১৯৭০ বিশ্বকাপে মেক্সিকোতে ইতালি সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির মুখোমুখি হয়। ৯০ মিনিটে ১-১ ড্র, অতিরিক্ত সময়ে ৪-৩ গোলে জিতে ইতালি ফাইনালে যায়। ম্যাচটি 'শতাব্দীর সেরা ম্যাচ' হিসেবে পরিচিত। ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে ৪-১ গোলে হেরে যায়, কিন্তু ভক্তরা বিশ্বাস করে যে ইতালি ফিরেছে। তাদের কৌশল 'কাতেনাচ্চিও'—দুর্ভেদ্য ডিফেন্স আর পাল্টা আক্রমণ।
১৯৮২: পাওলো রসির পুনরুত্থান
১৯৮২ বিশ্বকাপে ইতালি ফেবারিট ছিল না। গ্রুপ পর্বে তিন ড্র করে পরের রাউন্ডে যায়। দ্বিতীয় রাউন্ডের গ্রুপ অব ডেথে ছিল ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা আর ইতালি। প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারায় ইতালি। শেষ ম্যাচে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়, ব্রাজিলের ড্র করলেই সেমিফাইনাল নিশ্চিত। পাওলো রসি, যাকে নিয়ে সমালোচনা ছিল, সেই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন। ইতালি ৩-২ গোলে জিতে সেমিফাইনালে যায়। ফাইনালে জার্মানিকে হারিয়ে চার বছর পর বিশ্বকাপ জিতে নেয় ইতালি। রসি গোল্ডেন বল, গোল্ডেন বুট ও ব্যালন ডি'অর জিতেছিলেন।
১৯৯৪: বাজ্জিওর বিষাদ
১৯৯৪ বিশ্বকাপে রবার্তো বাজ্জিও একাই ইতালিকে ফাইনালে তুলেছিলেন। ফাইনালে ব্রাজিলের সঙ্গে টাইব্রেকারে শট পোস্টের ওপর দিয়ে উড়িয়ে দেন, ব্রাজিল চতুর্থবার কাপ জিতে নেয়।
২০০৬: চতুর্থ শিরোপা
২০০২ বিশ্বকাপে ইতালি দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হেরে যায়। ২০০৬ সালে জার্মানির মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ইতালি দুর্দান্ত খেলে। সেমিফাইনালে জার্মানিকে ২-০ গোলে হারায়, ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে ৫-৩ গোলে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।
বর্তমান সংকট
২০০৬ বিশ্বকাপ জেতার পর ইতালি ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বেই বাদ পড়ে। ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬ বিশ্বকাপে বাছাইপর্ব থেকেই বাদ পড়েছে। টানা তৃতীয়বারের মতো মূল পর্বে খেলার সুযোগ পেল না। বসনিয়া-হার্জেগোভিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরে বাদ পড়ে গেল।
সমস্যার মূল
ঘরোয়া ফুটবলের কাঠামো ইংল্যান্ড বা স্পেনের তুলনায় দুর্বল। নতুন খেলোয়াড়দের স্কিল শেখানো হচ্ছে না। সিরি আ-তে বিদেশি খেলোয়াড়ের কদর বেশি, দেশি খেলোয়াড় সুযোগ পায় না। বিশ্বমানের স্ট্রাইকারের অভাব। নানা পর্যায়ে দুর্নীতি। তবে ইতিহাস বলে, দৃঢ় ফুটবল-সংস্কৃতি থাকলে বারবার ব্যর্থতার পরও দল ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, স্পেন তা দেখিয়েছে। ইতালি নিজেও ৪৪ বছর পর বিশ্বকাপ জিতেছে। ২০২১ সালে ইউরো কাপ জিতেছে।
ইতালির ভক্তরা আশায় বুক বেঁধে আছেন। হয়তো একসময় কেটে যাবে এই দুঃস্বপ্ন। হয়তো কোনো অজানা খেলোয়াড় পাওলো রসির মতো ঝলসে উঠবেন বিশ্বমঞ্চে। তখন আজ্জুরিদের নীল রং বিষাদের নয়, বিজয়ের রং হবে।



