আত্মঘাতী গোলের মূল্য: ফুটবলের বলি আন্দ্রেস এসকোবারের করুণ কাহিনি
আত্মঘাতী গোলের মূল্য: ফুটবলের বলি আন্দ্রেস এসকোবার

লিভারপুলের কিংবদন্তি কোচ বিল শ্যাংকলি একবার বলেছিলেন, 'অনেকে মনে করে ফুটবল বাঁচা-মরার লড়াই। আমি গ্যারান্টি দিতে পারি, এটা এর থেকেও বেশি কিছু।' তার এই উক্তিটি আবেগের বহিঃপ্রকাশ হলেও বাস্তবেও কি কোনো খেলা কারও জীবনের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে? শুধু খেলাকে কেন্দ্র করে কি কারও জীবন কেড়ে নেওয়া সম্ভব? কলম্বিয়ার আন্দ্রেস এসকোবারের মর্মান্তিক ঘটনা প্রমাণ করে যে, খেলার কারণেও জীবন দিতে হতে পারে।

উচ্চাশা ও বাস্তবতা

১৯৯৪ বিশ্বকাপের আগে কলম্বিয়ার ফুটবল দলকে নিয়ে ভক্তদের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। শুধু নিজ দেশের সমর্থকই নয়, ফুটবলের রাজা পেলেও বাজি ধরেছিলেন কলম্বিয়ার পক্ষে। তাঁর মতে, ঠিকমতো খেলতে পারলে বিশ্বকাপটি কলম্বিয়ার ঘরেই যাবে। এই আশার পিছনে যুক্তি ছিল প্রবল। আগের বিশ্বকাপের রানার্সআপ আর্জেন্টিনাকে তারা ৫-০ গোলে হারিয়েছিল। টানা দুই বছর ২৮টি ম্যাচে অপরাজিত ছিল দলটি। কার্লোস ভালদেরামা, ফ্রেডি রিনকন, আদেলফো ভ্যালেন্সিয়ার মতো তারকারা কলম্বিয়ার জার্সি গায়ে মাঠ কাঁপাচ্ছিলেন।

কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই রোমানিয়ার কাছে ৩-১ গোলে হেরে যায় কলম্বিয়া। প্রথম ম্যাচের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই তাদের মুখোমুখি হতে হয় স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের। আর সেখানেই ঘটে নাটকীয় এক ঘটনা, যার কেন্দ্রে ছিলেন আন্দ্রেস এসকোবার। তাঁকে তখন কলম্বিয়ার অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে গণ্য করা হতো, যাঁকে ফাঁকি দিয়ে বল বের করা অসম্ভব মনে করা হতো। কিন্তু ম্যাচের ৩৫তম মিনিটে একটি দুর্বল ক্রস ক্লিয়ার করতে গিয়ে এসকোবার বল পাঠিয়ে দেন নিজেদের জালে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আত্মঘাতী গোলের পরিণতি

এসকোবারের সেই আত্মঘাতী গোলে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো কলম্বিয়া। ৫২তম মিনিটে আবার এসকোবারের পাশ দিয়ে ম্যাচের দ্বিতীয় গোল করেন যুক্তরাষ্ট্রের আর্নি স্টুয়ার্ট। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে কলম্বিয়া। সেই ম্যাচে আর ফিরতে পারেনি তারা। শেষ মিনিটে আদেলফো ভ্যালেন্সিয়া একটি গোল করলেও তা শুধু সান্ত্বনা হিসেবেই রইল। একটি আত্মঘাতী গোলেই প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় কলম্বিয়ার বিদায়। সারা দেশে এসকোবার খলনায়কে পরিণত হন।

শেষ ম্যাচে কলম্বিয়ার সুযোগ ছিল যদি রোমানিয়া হেরে যেত। কিন্তু সুইজারল্যান্ডকে ২-০ গোলে হারালেও রোমানিয়া জিতে যাওয়ায় কলম্বিয়া আর দ্বিতীয় পর্বে যেতে পারেনি। কে জানত, সেদিনই আন্দ্রেস এসকোবার নিজের মৃত্যু পরোয়ানা লিখে ফেলেছিলেন। পরিবারের লোকজন তাঁকে কয়েক দিন দেশের বাইরে থাকতে বললেও তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের মানুষ তাঁকে ক্ষমা করে দেবে।

মৃত্যু ও প্রতিশোধ

বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়ে দেশে ফেরার মাত্র ১০ দিন পর, ১৯৯৪ সালের ২ জুলাই মেডেলিন শহরের একটি নাইট ক্লাবের বাইরে এসকোবারকে মোট ছয়টি গুলি করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রতিটি ট্রিগার চাপার সময় খুনিরা 'গোওওওওওল!' বলে চিৎকার করছিল। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও এসকোবারকে বাঁচানো যায়নি। মাত্র ২৭ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন তিনি।

পরদিনই শহর থেকে খুনিকে গ্রেপ্তার করা হয়। খুনি নিজেই স্বীকার করে নেন, বিশ্বকাপে হারের জন্যই এসকোবারকে নিজ হাতে খুন করেছেন তিনি। কলম্বিয়া তখন ড্রাগ কার্টেল, মাফিয়া ও জুয়াড়িদের স্বর্গরাজ্য ছিল। ধারণা করা হয়, এসকোবারের আত্মঘাতী গোল ও বিশ্বকাপ থেকে প্রথম পর্বেই বাদ পড়ার কারণে বিশাল অঙ্কের বাজি হেরেছিল তারা। সেটার প্রতিশোধ নিতেই তাঁকে হত্যা করা হয়।

শেষকৃত্য ও স্মৃতি

এসকোবারকে বলা হতো 'ফুটবলের ভদ্রলোক'। এত শান্তশিষ্ট স্বভাবের মানুষটিকে প্রাণ হারাতে হয়েছিল একটি আত্মঘাতী গোলের কারণে। মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি কোনো রাগ ধরে রাখেনি মানুষ। এসকোবারের শেষকৃত্যে মেডেলিনের রাস্তায় নেমেছিল প্রায় দেড় লাখ মানুষ। তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর আত্মঘাতী গোলের জন্য নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের এক আর্তনাদ হয়ে।