২০২৬ বিশ্বকাপকে কেন ‘ডায়াসপোরা বিশ্বকাপ’ বলা হচ্ছে
২০২৬ বিশ্বকাপকে কেন ‘ডায়াসপোরা বিশ্বকাপ’ বলা হচ্ছে

বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে প্রথম ইংলিশ খেলোয়াড় ইংল্যান্ডের হয়ে খেলেননি। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে লিভারপুলে জন্ম নেওয়া সাবেক ট্র্যানমিয়ার রোভার্স ফরোয়ার্ড জর্জ মুরহাউস যুক্তরাষ্ট্রের জার্সি গায়ে মাঠে নামেন। সেই আসরে যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে তৃতীয় স্থান অর্জন করে। তাদের দলে আরও ছিলেন স্কটল্যান্ডে জন্ম নেওয়া পাঁচজন ফুটবলার।

মুরহাউস ১৯২৩ সালে কানাডায় পাড়ি জমান এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হন। অন্যদিকে স্কটিশ ফুটবলার অ্যান্ডি অল্ড ও জিম ব্রাউন যথাক্রমে ২১ ও ১৭ বছর বয়সে আমেরিকায় অভিবাসন করেন। বাকি তিনজন ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে সেখানে চলে যান। সেই সময়ের নিয়ম অনুযায়ী এসব কারণেই তারা যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন।

প্রায় এক শতাব্দী পরও বিশ্বকাপের চরিত্র নির্ধারণে অভিবাসন ও ঔপনিবেশিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমান বিশ্বকাপের বহু ফুটবলারের পারিবারিক শিকড় এক দেশে হলেও জন্ম ও বেড়ে ওঠা অন্য দেশে। ফলে জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে আরও জটিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অভিবাসনের ছাপ

সুইডেনের মিডফিল্ডার ইয়াসিন আয়ারি এর একটি উদাহরণ। তার বাবা তিউনিসিয়ার নাগরিক। তিউনিসিয়ার বিপক্ষে দুটি দুর্দান্ত গোল করলেও তিনি প্রথম গোল উদযাপনে অনীহা দেখান। সুইডেনে জন্ম নেওয়া আয়ারির মতো অনেক খেলোয়াড়ই এ বিশ্বকাপে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন, যেখানে তারা নিজেদের জন্মভূমির বিপক্ষেই খেলছেন। যেমন ফ্রান্স ও সেনেগালের ম্যাচ।

এ বিশ্বকাপে ৯৮ জন খেলোয়াড় ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেছেন। তবে তাদের মধ্যে ৭৬ জন ফ্রান্স নয়, অন্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন—যা যে কোনো দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ। সেনেগাল দলেরই ১০ জন খেলোয়াড় ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সবচেয়ে বেশি ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করা খেলোয়াড় রয়েছে আলজেরিয়ার দলে—১৩ জন। এরপর রয়েছে হাইতি (১২ জন)। আইভরি কোস্ট ও কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের দলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করা ফুটবলার আছেন।

মোট ১,২৪৮ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ২৯২ জনই নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করা দেশের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছেন। অংশগ্রহণকারী ৪৮টি দলের মধ্যে মাত্র আটটি দল ছাড়া বাকি সব দলের স্কোয়াডে অন্তত একজন বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড় রয়েছে।

এ দিক থেকে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দল কুরাসাও। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ক্যারিবীয় দ্বীপদেশটির স্কোয়াডের একজন ছাড়া বাকি সবাই নেদারল্যান্ডসে জন্মেছেন। দলটির কোচও ডাচ কিংবদন্তি ডিক অ্যাডভোকাট। খেলোয়াড়দের বড় অংশের সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের বন্দরনগরী রটারডামের সম্পর্ক রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসনের একটি প্রধান কেন্দ্র।

অন্যদিকে কিছু দল প্রকৃত অর্থেই বহুজাতিক। ব্রাজিলের বিপক্ষে মরক্কোর ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে থাকা মরক্কোর ১১ জন খেলোয়াড়ের সবাই দেশের বাইরে জন্মেছিলেন। কাতারের দলে রয়েছে আলজেরিয়া, বেলজিয়াম, ব্রাজিল, মিশর, ফ্রান্স, ঘানা, পর্তুগাল, সেনেগাল, সোমালিয়া, সুদান ও তিউনিসিয়ায় জন্ম নেওয়া ফুটবলার। সম্প্রসারিত ৪৮ দলের বিশ্বকাপে এমন খেলোয়াড়ও আছেন, যারা ক্যামেরুন, ডেনমার্ক বা ইতালির মতো বিশ্বকাপে না ওঠা দেশগুলোতে জন্মেছেন।

ফিফার নিয়মে পরিবর্তনের ইতিহাস

জাতীয় দলের হয়ে খেলার যোগ্যতা মূলত নাগরিকত্বের ওপর নির্ভর করে। জন্মসূত্রে কিংবা পরবর্তীতে নাগরিকত্ব অর্জনের মাধ্যমে একজন খেলোয়াড় কোনো দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন।

তবে দ্বৈত নাগরিকত্বধারী খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে বাস্তব সম্পর্ক থাকতে হয়। যেমন কোনো খেলোয়াড় ফরাসি ও সেনেগালিজ—উভয় নাগরিকত্বের অধিকারী হলে সেনেগালের হয়ে খেলতে হলে তাকে নিম্নোক্ত শর্তগুলোর অন্তত একটি পূরণ করতে হবে:

  • তার জন্ম সেনেগালে হতে হবে;
  • তার বাবা বা মা সেনেগালে জন্মগ্রহণ করে থাকতে হবে;
  • তার দাদা-দাদি বা নানা-নানি সেনেগালে জন্মগ্রহণ করে থাকতে হবে;
  • অথবা তিনি সেনেগালে অন্তত পাঁচ বছর বসবাস করে থাকতে হবে (১০ বছর বয়সের আগে হলে তিন বছর)।

২০০৪ সালের আগে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে কোনো দেশের প্রতিনিধিত্ব করলে খেলোয়াড়টি সেই দেশেই স্থায়ীভাবে আবদ্ধ হয়ে যেত। কিন্তু আলজেরিয়ান ফুটবল ফেডারেশন অভিযোগ করে যে এ নিয়মের কারণে তারা প্রবাসী প্রতিভাদের দলে টানতে পারছে না।

এর ফলে ২০০৪ সালে ফিফা নিয়ম পরিবর্তন করে। নতুন নিয়মে দ্বৈত নাগরিকত্বধারী কোনো খেলোয়াড় যদি সিনিয়র পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ না খেলে থাকে, তাহলে ২১ বছর বয়সের আগে একবার জাতীয়তা পরিবর্তনের সুযোগ পায়।

বর্তমান বিশ্বকাপের জামাল মুসিয়ালা ও ইউনুস মুসাহ এর উদাহরণ। দুজনই বয়সভিত্তিক পর্যায়ে এক দেশের প্রতিনিধিত্ব করলেও পরে অন্য দেশের হয়ে সিনিয়র ক্যারিয়ার বেছে নেন।

২০০৯ সালে আলজেরিয়ার আরও দাবির প্রেক্ষিতে ফিফা আবার নিয়ম শিথিল করে। তখন ২১ বছরের বেশি বয়সেও জাতীয়তা পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া হয়, যদি খেলোয়াড়টি কোনো প্রতিযোগিতামূলক সিনিয়র ম্যাচ না খেলে থাকে।

এ নিয়মের সুবিধা পেয়েছিলেন ব্রাজিলে জন্ম নেওয়া দিয়েগো কস্তা। ব্রাজিলের হয়ে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেললেও পরে তিনি স্পেনের হয়ে খেলেন এবং ২৪ ম্যাচে ১০ গোল করেন।

সাম্প্রতিক উদাহরণের মধ্যে আছেন ব্রায়ান গুতিয়েরেজ, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলে পরে মেক্সিকোকে বেছে নেন। একইভাবে ডেকলান রাইস রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের হয়ে তিনটি প্রীতি ম্যাচ খেলার পর ইংল্যান্ডে যোগ দেন।

মুনির আল হাদ্দাদির মামলা ও নতুন যুগ

স্পেনে জন্ম নেওয়া মুনির আল হাদ্দাদির বাবা মরক্কোর নাগরিক। বার্সেলোনার হয়ে অভিষেকের কিছুদিন পর ২০১৪ সালে তিনি স্পেনের হয়ে ইউরো বাছাইপর্বের একটি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে মাত্র ১৩ মিনিট খেলেন।

তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী এটিই তার আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ স্থির করে দেয়। ফলে মরক্কোর হয়ে খেলার আবেদন প্রথমে ফিফা প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু সাত বছর পর তাকে অনুমতি দেওয়া হয়।

মুনিরের ঘটনাই ২০২০ সালের নতুন নিয়ম প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় ২১ বছর বয়সের আগে সর্বোচ্চ তিনটি প্রতিযোগিতামূলক সিনিয়র ম্যাচ খেললেও পরবর্তীতে তিন বছর অপেক্ষা করে একবার জাতীয়তা পরিবর্তন করতে পারবেন, যদি তিনি কখনও বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের মূল পর্বে অংশ না নিয়ে থাকেন।

একই সঙ্গে ফিফা আরও স্পষ্ট করে দেয় যে শুধুমাত্র খেলাধুলার উদ্দেশ্যে নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। খেলোয়াড়কে দেশের সঙ্গে প্রকৃত সম্পর্ক প্রমাণ করতে হবে।

এ সিদ্ধান্তের পেছনে আংশিকভাবে কাজ করেছে ২০০৪ সালের একটি বিতর্কিত ঘটনা। ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার আইলটন কাতারের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায় এবং সে সময় তাকে প্রায় ১০ লাখ পাউন্ড প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অথচ তার সঙ্গে কাতারের কোনো পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল না।

খেলোয়াড় খোঁজার নতুন পদ্ধতি

বর্তমানে অনেক ফুটবল ফেডারেশন প্রবাসী বা দ্বৈত নাগরিকত্বধারী খেলোয়াড় খুঁজে বের করার জন্য বিশেষ স্কাউট নিয়োগ করে।

তারা ট্রান্সফার মার্কেটের মতো ডাটাবেস ব্যবহার করে, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তথ্য খোঁজে, স্থানীয় ক্লাবের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খেলোয়াড়দের পারিবারিক ইতিহাস অনুসন্ধান করে।

কখনও কখনও ঘটনাগুলো বেশ অদ্ভুতও হয়। ২০২৪ সালে কানাডিয়ান উইঙ্গার লিয়াম মিলারের সঙ্গে সাউনায় আড্ডা দিতে গিয়ে সাবেক হাল সিটি ডিফেন্ডার আলফি জোনস জানান, তার দাদি কানাডায় জন্মেছিলেন। সেই তথ্য পরে কানাডার কোচিং স্টাফের কাছে পৌঁছে যায় এবং এক বছরের মধ্যেই তিনি জাতীয় দলে অভিষেক করেন।

কানাডার ডিফেন্ডার লুক দ্য ফুজেরোলেসের ক্ষেত্রে তার বাবা জ্যাঁ দ্য ফুজেরোলেস লিংকডইনের মাধ্যমে কানাডার বয়সভিত্তিক দলের কোচের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। সেখান থেকেই জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার পথ তৈরি হয়।

এমনকি জনপ্রিয় ফুটবল সিমুলেশন গেম ‘ফুটবল ম্যানেজার’-ও এখন অনেক ফেডারেশনের তথ্যসূত্র। ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া বেন ব্রেরেটন দিয়াজের মা যে চিলিয়ান—এই তথ্য গেমটির গবেষকরা খুঁজে বের করেছিলেন। পরে সেই তথ্যের ভিত্তিতেই তাকে চিলির হয়ে খেলার জন্য উৎসাহিত করা হয়।

জাতীয় পরিচয় বনাম ব্যক্তিগত শিকড়

যোগ্যতা নির্ধারণের পর শুরু হয় খেলোয়াড়কে রাজি করানোর প্রক্রিয়া। অনেক ফেডারেশন খেলোয়াড় ও তাদের পরিবারকে বিশেষ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায়, সাংস্কৃতিক সংযোগ গড়ে তোলে এবং জাতীয় দলের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার চেষ্টা করে।

পোল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বছরে দুবার লন্ডন ও ম্যানচেস্টারে পোলিশ বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় ও তাদের পরিবারের জন্য বিশেষ আয়োজন করে। সেখানে দেশের সংস্কৃতি, খাবার ও জাতীয় দলের সঙ্গে সম্পর্ক তুলে ধরা হয়।

তবে সবশেষে সিদ্ধান্তটি ব্যক্তিগত। দিয়েগো কস্তা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যে দেশে জন্মেছেন এবং যে দেশ আপনাকে সবকিছু দিয়েছে—এই দুটির মধ্যে নির্বাচন করা খুব কঠিন।

আধুনিক বিশ্বকাপের বাস্তবতাও ঠিক এমনই। উদাহরণ হিসেবে সেনেগালের ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করা খেলোয়াড়দের কথা বলা যায়। তারা সবাই ফ্রান্সের লিগ ওয়ানের একাডেমিতে গড়ে উঠেছেন, কিন্তু তাদের পারিবারিক শিকড় সেনেগালে। জন্মভূমি ও পূর্বপুরুষের দেশের মধ্যে এই টানাপোড়েনই আজকের বিশ্বকাপকে পরিণত করেছে প্রকৃত অর্থে একটি ‘ডায়াসপোরা বিশ্বকাপ’-এ।